বিশেষ প্রতিবেদক: গত ১৮ জুলাই জাতীয় সাপ্তাহিক ‘তদন্ত রিপোর্ট’ পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে ‘শ্যাম কালার পকেটে সিলেটের ডিবি’ শীর্ষক একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই সিলেটের সীমান্তবর্তী গোয়াইনঘাট উপজেলা ও জেলা ডিবি পুলিশের অভ্যন্তরে তীব্র ক্ষোভ ও অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছে। এই সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর সচেতন মহলে জেলা ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এবং অ্যাডমিনের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠলেও, বাস্তবে সীমান্তে ডিবির নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজির মহোৎসব বিন্দুমাত্র থামেনি। উল্টো, সংবাদ প্রকাশের পরপরই তা ধামাচাপা দিতে এবং সাংবাদিকদের ‘ম্যানেজ’ করতে সিন্ডিকেটের পক্ষ থেকে শুরু হয়েছে নজিরবিহীন ও নির্লজ্জ তৎপরতা।
‘সংবাদ প্রকাশের মাত্র ২০ মিনিটের মাথায় অন্তত ৬ জন স্থানীয় সাংবাদিক তদন্ত রিপোর্ট কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে সংবাদটি মুছে ফেলার জোর তদবির চালান। জানা যায়, শ্যাম কালার চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য ও সুপরিচিত চোরাকারবারি দেলোয়ারের নির্দেশেই এই তদবির বাণিজ্য শুরু হয়। কেউ কেউ সরাসরি অর্থের প্রলোভন দেখিয়ে সংবাদটি সরাতে চান।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটে গত ২০ জুলাই রাতে। পূবালী ব্যাংকের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে সাপ্তাহিক তদন্ত রিপোর্ট পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের ব্যক্তিগত নম্বরে বিকাশের মাধ্যমে ২,৫০০ টাকা প্রেরণ করা হয়। এর ঠিক ৩-৪ মিনিট পর সিলেটের শীর্ষ চোরাকারবারি ও স্বঘোষিত ‘ডিবি পুলিশের লাইনম্যান কমিটির সভাপতি’ শ্যাম কালার ব্যক্তিগত ফেসবুক মেসেঞ্জার থেকে একটি অডিও বার্তা আসে।
বার্তায় তাকে বলতে শোনা যায়, “ভাই এখন আপাততঃ সবকিছু বন্ধ। আমিও নিরুপায়। একটা মেসেজ পাঠাইছি, যদি মন চায় ছোট ভাইকে মায়া করবেন, আর না করলে নাই।” টাকা পাঠানোর কারণ জানতে চাইলে সে আর কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি। জনমনে এখন একটিই প্রশ্ন জোরপূর্বক বিকাশে টাকা পাঠিয়ে সাংবাদিককে ম্যানেজ করার এই অপচেষ্টা কি সরাসরি প্রমাণ করে না যে প্রকাশিত সংবাদের প্রতিটি শব্দ ধ্রুব সত্য? এই ঘটনা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, অপরাধবোধ ও দুর্নীতির আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা এই চক্রটি গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করতে যেকোনো হীন পন্থা অবলম্বনে প্রস্তুত। উপজেলার বিস্তীর্ণ সীমান্তজুড়ে ভারতীয় চোরাচালান পণ্য থেকে সিলেট জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের নাম ভাঙিয়ে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অভিযোগের তীর সরাসরি জেলা ডিবি (উত্তর) জোনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশরাফ ও অ্যাডমিন আনোয়ারের দিকে
অনুসন্ধানে জানা যায়, সিলেট জেলা ডিবি (উত্তর) জোনের ওসি আশরাফ ও অ্যাডমিন আনোয়ারের প্রত্যক্ষ মদদে মাসিক ৫ লাখ টাকার চুক্তিতে গোয়াইনঘাট সীমান্তে চাঁদাবাজি ও চোরাচালানের অলিখিত ইজারা নিয়েছে এই শ্যাম কালা। তার নেতৃত্বে চারটি ইউনিয়নে সক্রিয় রয়েছে বিশাল এক সিন্ডিকেট। পশ্চিম জাফলংয়ে হাকিম ও দিলু, মধ্য জাফলংয়ে আল-আমিন ও কামাল, পূর্ব জাফলংয়ে রিয়াজুল এবং বিছানাকান্দিতে নুরু ও দেলোয়ার মোল্লার মতো বিতর্কিত ব্যক্তিরা এর দায়িত্বে রয়েছে। চাঁদা না দিলে ডিবির ভয় দেখিয়ে ব্যবসায়ীদের হয়রানি, মিথ্যা মামলা এবং জব্দকৃত মালামাল কাগজে-কলমে কম দেখিয়ে কালোবাজারে বিক্রির মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে এই চক্রের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি নন্দিরগাঁও ইউনিয়নে জব্দ করা চাল ও জিরার বড় একটি অংশ গায়েব করে দেওয়ার ঘটনা এর জ্বলন্ত প্রমাণ। গত ১১ জুলাই আঙ্গারজুর গ্রামে ডিবির অভিযানে ৯৮ বস্তা বাসমতী চাল ও ৪৫ বস্তা জিরা জব্দ হলেও, এজাহারে দেখানো হয় মাত্র ৬৫ বস্তা চাল ও ২৫ বস্তা জিরা। গায়েব হওয়া ৩৩ বস্তা চাল ও ২০ বস্তা জিরা শ্যাম কালার মাধ্যমে কালোবাজারে বিক্রি করে সেই অর্থ ডিবি কর্মকর্তা ও সিন্ডিকেটের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই বেপরোয়া চক্রটি কেবল অসাধু পুলিশ কর্মকর্তাদের সাথেই নয়, কতিপয় রাজনীতিবিদের সাথেও গভীর আঁতাত গড়ে তুলেছে। সিলেট জেলা বিএনপির ক্রীড়া সম্পাদক তারিয়াং স্টারলিনের নাম এই সিন্ডিকেটের অন্যতম ‘রক্ষাকবচ’ হিসেবে উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, আদায়কৃত চাঁদার একটি বড় অংশ তার টেবিলেও পৌঁছায়। এ বিষয়ে মূল অভিযুক্ত শ্যাম কালার মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। অন্যদিকে, সিলেট জেলা ডিবি (উত্তর) জোনের ওসি আশরাফ ব্যস্ততার অজুহাতে এড়িয়ে যান এবং অ্যাডমিন আনোয়ার চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করে তড়িঘড়ি করে ফোন কেটে দেন।
প্রশাসনের দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের এমন কর্মকাণ্ডে জেলা ডিবির সাধারণ পুলিশ সদস্যদের মাঝেও চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। অবিলম্বে এই চোরাচালান ও চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে স্থানীয় সচেতন মহল।
Leave a Reply