বিশেষ প্রতিবেদক: সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার সীমান্তজুড়ে ভারতীয় চোরাচালান পণ্য থেকে সিলেট জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের নাম ভাঙিয়ে লাখ লাখ টাকা চাঁদাবাজির এক ভয়ংকর অভিযোগ উঠেছে। জেলা ডিবি পুলিশের ‘লাইনম্যান’ পরিচয়ে একটি সংঘবদ্ধ ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেট পুরো সীমান্ত এলাকাকে কার্যত নিজেদের জিম্মায় নিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, খোদ জেলা ডিবি (উত্তর) জোনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশরাফ ও অ্যাডমিন আনোয়ারের প্রত্যক্ষ মদদে এবং মাসিক ৫ লাখ টাকার চুক্তিতে এই চাঁদাবাজির অলিখিত ইজারা নিয়েছেন সিলেটের শীর্ষ চোরাকারবারি ও স্বঘোষিত ডিবি পুলিশের লাইনম্যান কমিটির সভাপতি ‘শ্যাম কালা’। চোখের সামনে এমন প্রকাশ্য চাঁদাবাজি ও চোরাচালান চললেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন যেন রহস্যজনক কারণে নির্বিকার।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গোয়াইনঘাট উপজেলার সীমান্তবর্তী ৪টি ইউনিয়নে শ্যাম কালার নেতৃত্বে একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেট এই চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রতিটি পণ্যের জন্যই নির্ধারিত রয়েছে নির্দিষ্ট অঙ্কের ‘চাঁদা’। ইউনিয়নভিত্তিক এই চাঁদাবাজির দায়িত্বে রয়েছেন শ্যাম কালার বিশ্বস্ত অনুচররা। পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নে হাকিম ও দিলু। মধ্য জাফলং ইউনিয়নে আল-আমিন ও কামাল। পূর্ব জাফলং ইউনিয়নে মন্নান মেম্বারের পুত্র রিয়াজুল। বিছানাকান্দি ইউনিয়নে নুরু, দেলোয়ার মোল্লা ও নজরুল মোল্লা। সিন্ডিকেটের এই সদস্যদের অনেকেই সরাসরি চোরাচালানের সাথে সম্পৃক্ত। এদের মধ্যে ট্র্যাক্টর চালক নুরু স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকেই ডিবির নাম ভাঙিয়ে রাতারাতি কোটিপতি বনে গেছেন, নির্মাণ করেছেন সুবিশাল অট্টালিকা। অন্যদিকে, সিলেটে বহুল আলোচিত ‘১৪ ট্রাক ভারতীয় চিনি কেলেঙ্কারি’ মামলার মূলহোতা দেলোয়ার মোল্লা দীর্ঘদিন কারাভোগের পর জামিনে বেরিয়ে আবারও শ্যাম কালার এই চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটে সক্রিয় হয়েছেন।
পণ্যবাহী কোনো চালক বা মালিক চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে শ্যাম কালা রীতিমতো হুংকার দিয়ে বলেন, “জেলা ডিবির ওসি আশরাফ ও অ্যাডমিন আনোয়ার স্যারকে মাসের ১ তারিখে নিজ পকেট থেকে ২ লাখ এবং ১৫ তারিখে ক্যাশ ৩ লাখ টাকা দিতে হয়। এসব টাকা কি পানিতে ভেসে আসে? চুপচাপ টাকা দেন, নইলে ডিবির হাতে তুলে দেব।” নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চোরাকারবারি ও চালক জানান, চাঁদা না দিলে শ্যাম কালার ইশারায় ডিবি পুলিশ দিয়ে মালামাল আটক করে মামলা ঠুকে দেওয়া হয়।
শুধু চাঁদাবাজি বা মামলাই নয়, জব্দকৃত মালামাল আত্মসাতেরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে এই চক্রের বিরুদ্ধে। ডিবির অভিযানে বিপুল পরিমাণ মালামাল আটক হলেও কাগজে-কলমে দেখানো হয় যৎসামান্য। সর্বশেষ গত ১১ জুলাই রাত আনুমানিক ৮টা ২০ মিনিটে গোয়াইনঘাটের ৭নং নন্দিরগাঁও ইউনিয়নের আঙ্গারজুর গ্রামের জনৈক হরমান আলীর বাড়িতে কালার ইশারায় এবং ওসি আশরাফ ও অ্যাডমিন আনোয়ারের নির্দেশনায় অভিযান চালায় ডিবি পুলিশ। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ওই অভিযানে ৫ হাজার টাকা মূল্যের ৯৮ বস্তা ভারতীয় বাসমতী চাল এবং ১২ হাজার টাকা মূল্যের ৪৫ বস্তা ভারতীয় জিরা জব্দ করা হয়। কিন্তু বিস্ময়করভাবে, জেলা ডিবির এসআই (নিরস্ত্র) মো. সেলিম আহমেদ বাদী হয়ে গোয়াইনঘাট থানায় দায়ের করা এজাহারে জব্দ দেখিয়েছেন মাত্র ৬৫ বস্তা চাল ও ২৫ বস্তা জিরা। জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, বাকি ৩৩ বস্তা চাল এবং ২০ বস্তা জিরা গেল কোথায়? এই ঘটনায় ১২ জুলাই ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫বি(১)(বি)/২৫(ডি) ধারায় গোয়াইনঘাট থানায় একটি মামলা (নং- ১৮) রুজু করা হয়, যেখানে কোম্পানীগঞ্জের জুবেল মিয়া (৩৫) এবং আঙ্গারজুরের হরমান আলীকে (৬৫) আসামি করা হয়েছে।
একাধিক বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, সরিয়ে ফেলা এই বিপুল পরিমাণ মালামাল শ্যাম কালার মাধ্যমে জৈন্তাপুর উপজেলার জেলা ডিবি পুলিশের আরেক লাইনম্যান এবং বিএনপি নেতা আব্দুর রশিদ চেয়ারম্যানের পুত্র মাসুকের হাত ধরে হরিপুর বাজারের বিভিন্ন চোরাকারবারির কাছে বিক্রি করা হয়। বিক্রিলব্ধ এই কালো টাকা ওসি আশরাফ, অ্যাডমিন আনোয়ার এবং শ্যাম কালার মধ্যে সমবণ্টন হয়। একই কায়দায় সম্প্রতি গোয়াইনঘাটের নোয়াগাঁও এবং হরিপুরে আরও দুটি বড় চালান আটকে এভাবেই নয়ছয় করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই চোরাকারবারি ও চাঁদাবাজ চক্রটি শুধু পুলিশের সাথেই নয়, অসাধু রাজনীতিকদের সাথেও গভীর আঁতাত গড়ে তুলেছে। চোরাকারবারিদের ভাষ্যমতে, সিলেট জেলা বিএনপির ক্রীড়া সম্পাদক ‘তারিয়াং স্টারলিন’ এই সিন্ডিকেটের অন্যতম রক্ষাকবচ। তিনি নাকি সিলেটের ডিআইজি, এসপিসহ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করে দেওয়ার দম্ভোক্তি করে চোরাকারবারিদের অভয় দিয়ে থাকেন। মাস শেষে ডিবি পুলিশের নামে আদায়কৃত এই বিপুল পরিমাণ চাঁদার একটি মোটা অংশ হরিপুরের মামুন ও জাফলংয়ের নামিজ খাঁনের হাত ধরে তারিয়াং স্টারলিনের টেবিলে পৌঁছে যায় বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
ভারত থেকে অবৈধপথে আসা গরু, মহিষ, মোটরসাইকেল, কসমেটিকস, চিনি, জিরা, কম্বলসহ যাবতীয় পণ্য জৈন্তাপুর ও গোয়াইনঘাট সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশ করছে। আর এসব চোরাই পণ্যের চালান থেকে ডিবি পুলিশের নাম ভাঙিয়ে কালা সিন্ডিকেট প্রতিদিন প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ টাকা চাঁদা আদায় করছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে এমন বেপরোয়া চাঁদাবাজি ও চোরাচালান চললেও প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না থাকায় স্থানীয় সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ বিরাজ করছে। অতি মুনাফার লোভে চোরাকারবারে জড়িয়ে শ্যাম কালার তাণ্ডবে নিঃস্ব হচ্ছেন অনেক সাধারণ ব্যবসায়ী। অন্যদিকে, দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের এমন কর্মকাণ্ডে জেলা ডিবির সৎ ও সাধারণ পুলিশ সদস্যদের মাঝেও ভেতরে ভেতরে চরম অসন্তোষ ধিকিধিকি জ্বলছে।
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে ডিবি পুলিশের লাইনম্যান কমিটির সভাপতি ও শীর্ষ চোরাকারবারি শ্যাম কালার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
এসব বিষয়ে সিলেট জেলা ডিবি (উত্তর) জোনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশরাফের ব্যবহৃত নাম্বারে যোগাযোগ করলে তিনি জানান- এ মূহুর্তে বাহিরে অবস্থান করছেন, অল্প কিছুক্ষণ পর তিনি কল দিচ্ছেন বলে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। একই বিষয়ে সিলেট জেলা ডিবি (উত্তর) জোনের অ্যাডমিন আনোয়ারের ব্যবহৃত নাম্বারে যোগাযোগ করলে তিনি জানান- আমাদের এরকম কোন লাইন নেই যার প্রমাণ হিসিবে তিনি বিগত সময়ে জেলা ডিবির চোরাচালান বিরোধী অভিযানের বিবরণ দেন। তবে মাসিক ৫ লাখ টাকার চুক্তিতে এই চাঁদাবাজির অলিখিত এমন ইজারা কাউকে দিয়েছেন কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, এসব সম্পূর্ণ মিথ্যা বলেই তড়িঘড়ি করে তিনি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।
Leave a Reply