বিশেষ প্রতিবেদক: সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার সীমান্ত জনপদ এখন এক মূর্তমান আতঙ্ক ও ত্রাসের রাজত্বে পরিণত হয়েছে। আইনের শাসনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পুরো সীমান্ত এলাকা জিম্মি করে রেখেছে ‘জুবের বাহিনী’। সিনেমাকেও হার মানানো উত্থানে মাত্র চার বছর আগের এক সাধারণ কসমেটিকস বিক্রেতা জুবের আহমদ এখন কোটি কোটি টাকা, বিলাসবহুল গাড়ি, দুবাই-সিঙ্গাপুরে প্রমোদভ্রমণ এবং অঢেল বেনামি সম্পদের মালিক। স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্তজুড়ে চোরাচালান, বালি লুটপাট এবং পৈশাচিক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে জুবের এখন নিজেকে গোয়াইনঘাটের স্বঘোষিত ‘রাজা’ হিসেবে জাহির করছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২০ সালে বিজিবির এক অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে সীমান্ত দিয়ে অবৈধ কারবারে হাতেখড়ি হয় জুবেরের। বর্তমানে হাজিপুর, কনাই জঙ্গল ও আহারকান্দি এলাকার বালি লুটপাট এবং নকশিয়া পুঞ্জি সীমান্ত দিয়ে মদ, চিনি, গরু ও স্বর্ণ চোরাচালানের একচ্ছত্র সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন তিনি। অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী ইমরান আহমদের পিএসের ‘খাস লোক’ হিসেবে পরিচিত জুবের গত ৫ আগস্টের পর রাতারাতি ভোল পাল্টে যুবদলের প্রভাবশালী নেতা সেজে বসেছেন। বর্তমানে তিনি উপজেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী হতে জোর লবিং চালাচ্ছেন। অভিযোগ উঠেছে, সিলেট জেলা ও বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাদের অনৈতিক সুবিধা ও বালি ব্যবসায় অংশীদারিত্ব দিয়ে তিনি সবার মুখ বন্ধ করে রেখেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, সিলেট নগরীর জেল রোডে বিলাসবহুল হোটেল, উপশহরে আলিশান বাড়িসহ বিপুল অবৈধ সম্পদের মালিক জুবের যুবদলের নাম ভাঙিয়ে দলের চেইন অব কমান্ড ধ্বংস করছেন। সিলেটের কিছু শীর্ষ নেতার মদদে জুবের এতটাই বেপরোয়া যে তার বিরুদ্ধে কেউ কথা বলার সাহস পাচ্ছে না। অথচ জুবেরের বাবা এখনো একটি মসজিদে ইমামতি করে সাধারণ জীবনযাপন করছেন।
জুবের বাহিনীর হিংস্রতা সব সীমা ছাড়িয়ে গেছে। বালুমহাল নিয়ে বিরোধের জের ধরে তার অনুসারীরা স্থানীয় তোফায়েল আহমদ নামে এক ব্যক্তির বাড়িতে পৈশাচিক হামলা চালায়। হামলায় তোফায়েলের বৃদ্ধ বাবার একটি আঙুল কেটে নিয়ে জুবেরকে ‘উপহার’ দেয় সন্ত্রাসীরা। অভিযোগ উঠেছে, জামিন অযোগ্য ও অ-আপোষযোগ্য এই পৈশাচিক অপরাধটি মাত্র ৩ লাখ টাকার বিনিময়ে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন গোয়াইনঘাট থানার এসআই ফয়েজ উদ্দিন।
ঘটনার বিষয়ে গোয়াইনঘাট উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট শাহজাহান সিদ্দিকী স্পষ্ট জানিয়েছেন, যুবদলের নাম ভাঙিয়ে কোনো অপরাধীকে ছাড় দেওয়া হবে না; অবৈধ কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে সাংগঠনিক কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কেন্দ্রীয় যুবদল সূত্রেও জানা গেছে, জুবেরের বিরুদ্ধে নানা গুরুতর অভিযোগ তাদের হস্তগত হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের পক্ষ থেকেও তদন্তের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সিলেট কার্যালয়ের একটি বিশস্ত সুত্র জানায়, মাত্র চার বছরে একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কোটিপতি বনে যাওয়া অস্বাভাবিক। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলেই তার অবৈধ সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে নামবে দুদক। এসব ব্যাপারে জুবের আহমেদের ব্যবহৃত সেলফোনে যোগাযোগ করলে ফোনকল রিসিভ না করায় বক্তব্য মিলেনি।
গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওমর ফারুক মোড়ল জানান, অপরাধী যে দলেরই হোক তাকে ছাড় দেওয়া হবে না এবং তোফায়েলের বাড়িতে হামলার ঘটনাটি পুনরায় গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা হবে। জুবের ও তার বাহিনীর লাগামহীন তাণ্ডবে সীমান্ত জনপদের সাধারণ মানুষের জীবন এখন অতিষ্ঠ। এই মাফিয়া চক্রের হাত থেকে বাঁচতে এবং জুবেরের অবৈধ সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন অনুসন্ধানে প্রশাসনের তাৎক্ষণিক ও কঠোর আইনি হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন গোয়াইনঘাটের আতঙ্কিত অধিবাসীরা।
Leave a Reply