তদন্ত প্রতিবেদক: সিলেট নগরীর রাজপথ যেন আজ গুটিকয়েক পরিবহন চাঁদাবাজ ও বেপরোয়া লেগুনা চালকদের পৈতৃক সম্পত্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে। নগরীতে বর্তমানে বৈধতার চেয়ে অবৈধতার প্রমত্ত দাপটই সর্বাধিক দৃশ্যমান। একটি বৈধ গাড়ি রাস্তায় নামাতে যেখানে ড্রাইভিং লাইসেন্স, মালিকানার বৈধ কাগজপত্র, রুট পারমিট, ফিটনেস সার্টিফিকেট, রোড ট্যাক্স এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রসহ ডজনখানেক প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম-নীতির বেড়াজালে আবদ্ধ হতে হয়, সেখানে এসবের বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে ট্রাফিক পুলিশের স্রেফ ‘টোকেন’ বা উৎকোচের জোরে গোটা শহর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সহস্রাধিক লক্কড়ঝক্কড় ও অবৈধ লেগুনা। বৈধ যানের মালিকদের পদে পদে জবাবদিহির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হলেও, প্রশাসনের নাকের ডগায় এই অবৈধ যানগুলো যেন ধরাছোঁয়ার সম্পূর্ণ ঊর্ধ্বে!
সিলেটের রাজপথে এখন ওপেন সিক্রেট এক জাদুর কাঠির নাম পুলিশ ‘টোকেন’। নির্ধারিত অংকের মাসোহারার বিনিময়ে সংগৃহীত এই টোকেনই যেন যাবতীয় অপরাধ ও নিয়মভঙ্গের সর্বজনীন লাইসেন্স। এই জাদুর টোকেন প্রদর্শন করলেই ট্রাফিক আইন ও পুলিশের যাবতীয় নজরদারি থেকে মেলে শর্তহীন দায়মুক্তি।
সরজমিন দেখা গেছে- নগরীর জেলরোড থেকে শুরু করে ওসমানী উদ্যানের রাস্তার একাংশ দখল করে বছরের পর বছর ধরে গড়ে উঠেছে লেগুনার সুবিশাল অবৈধ স্ট্যান্ড এবং কোর্ট পয়েন্ট, বটেশ্বর বাজার, পীরের বাজার, জিন্দাবাজারসহ টিলাগড় পয়েন্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে গাড়ি পার্কিং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকলেও, সেখানেই বুক ফুলিয়ে গড়ে উঠেছে অবৈধ স্ট্যান্ড।
‘সিলেট জেলা হিউম্যান হলার চালক শ্রমিক ইউনিয়ন’-এর নামে প্রকাশ্যে ছাপানো রশিদ দিয়ে প্রতিটি লেগুনা থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হচ্ছে, অথচ এর বিনিময়ে চালকদের নুন্যতম কোনো সুবিধাই প্রদান করা হয় না। বর্তমানে তামাবিল মহাসড়কস্থ জৈন্তাপুর থেকে টিলাগড় হয়ে নগরীর বন্দরবাজার রুটে সবচেয়ে বেশি লেগুনা চলাচল করে। যাত্রী তোলার অসুস্থ ও বেপরোয়া প্রতিযোগিতার কারণে যানজট এখন সিলেট নগরবাসীর নিত্যদিনের অভিশাপ।
সবচেয়ে ভয়াবহ ও গা শিউরে ওঠার মতো বিষয় হলো, এসব ফিটনেসবিহীন যানের স্টিয়ারিং হুইল সামলাচ্ছে অপরিণত বয়সের শিশু-কিশোর ও লাইসেন্সবিহীন অদক্ষ চালকেরা। অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করে, বেপরোয়া গতির উন্মাদনায় ছুটে চলা এসব যানের কারণে বিশেষ করে সিলেটের তামাবিল মহাসড়ক এখন এক ভয়ংকর বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছে।
গত দুই বছরে সিলেট বিভাগে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭৩৯ জন মানুষের মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর মিছিলের প্রধানতম অনুঘটক হলো ফিটনেসবিহীন যান এবং চালকের আসনে অনভিজ্ঞ শিশু ও কিশোরদের উপস্থিতি।
বিআরটিএ-এর দাপ্তরিক তথ্যমতে, সিলেট নগরীতে বৈধভাবে নিবন্ধিত লেগুনার সংখ্যা মাত্র ২,১০৪টি। অথচ রাজপথে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে এই সংখ্যার চেয়েও ৫গুণ বেশি বলে প্রতীয়মান হয়। বিআরটিএ এবং ট্রাফিক পুলিশ ‘নিয়মিত অভিযান’, ‘মামলা’ এবং ‘ডাম্পিং’-এর বুলি আউড়িয়ে নিজেদের দায় সারার চেষ্টা করলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই চরম বৈষম্যমূলক ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার কারণে বৈধ পরিবহন ব্যবসায়ীরা আজ চরম হতাশ ও দিশেহারা। ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীদের মতে যেখানে নিয়ম মেনে সরকারের রাজস্ব প্রদান করে হয়রানির শিকার হতে হয়, আর ঘুষের টোকেন পকেটে রাখলে সব অনিয়মই সিদ্ধ হয়ে যায়, সেখানে বৈধতার চেয়ে অবৈধতার পথ বেছে নেওয়াই যেন বেশি লাভজনক!
প্রশাসন যদি সত্যিই আইন প্রয়োগে কঠোর হয়, তবে কীভাবে বছরের পর বছর রাস্তার একাংশ দখল করে এই অবৈধ স্ট্যান্ডগুলো টিকে আছে? কীভাবে একটি সিন্ডিকেট শুধু কাগজের রশিদের জোরে রাষ্ট্রের প্রচলিত সব নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে? সাধারণ মানুষের জীবনের কি কোনোই মূল্য নেই এই ট্রাফিক পুলিশের টোকেন-বাণিজ্যের কাছে? অবিলম্বে এই সর্বনাশা দুর্নীতি, নৈরাজ্য ও টোকেন-বাণিজ্যের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান ও দৃশ্যমান কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে, অচিরেই সিলেটের সড়কগুলো সাধারণ মানুষের জন্য এক স্থায়ী মরণফাঁদে পরিণত হবে।
Leave a Reply