তদন্ত প্রতিবেদক: সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) ট্রাফিক বিভাগে রক্ষকই অবতীর্ণ হয়েছেন ভক্ষকের ভূমিকায়। সরকারি কোষাগারের অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া মামলা দায়ের এবং নিরীহ চালকদের জিম্মি করে দুর্নীতির এক সুবিশাল ও অভেদ্য সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) শফিক এবং সার্জেন্ট আসাদ। দীর্ঘদিন যাবৎ ঊর্ধ্বতনের নজর এড়িয়ে তারা এই রামরাজত্ব টিকিয়ে রেখেছেন, যেখানে প্রতিনিয়ত মেহনতি চালকদের রক্তঘামে উপার্জিত অর্থ লুণ্ঠিত হচ্ছে।
অনুসন্ধানে প্রতীয়মান হয় যে, কোনো চালককে দশ হাজার টাকার মামলার পরিকাঠামোতে আবদ্ধ করার পর শুরু হয় সার্জেন্ট আসাদ ও টিআই শফিকের মূল কারসাজি। ভুক্তভোগী চালক ট্রাফিক কার্যালয়ে উপস্থিত হলে সার্জেন্ট আসাদ স্বীয় ব্যক্তিগত ‘ইউক্যাশ’ (Ucash) হিসাবের মাধ্যমে মামলার অর্থ সংগ্রহ করেন। স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে জরিমানার অর্থের ওপর তিন থেকে চার হাজার টাকা মওকুফ বা ‘অটোমেটিক ডিসকাউন্ট’ প্রাপ্তির বিধান থাকলেও, চালকদের নিকট থেকে সম্পূর্ণ দশ হাজার টাকাই বলপূর্বক আদায় করা হয়। পরবর্তীতে এই মওকুফকৃত উদ্বৃত্ত অর্থ টিআই শফিক, সার্জেন্ট আসাদ এবং তাদের কার্যালয়ের সহায়কবৃন্দ পারস্পরিক যোগসাজশে আত্মসাৎ করেন।
বিধিনিষেধের তোয়াক্কা না করে, আটশত থেকে এক হাজার টাকার উৎকোচের বিনিময়ে নিষিদ্ধ সময়েও শহরে ভারী যানবাহন ও ডিস্ট্রিক্ট ট্রাক প্রবেশের অবৈধ অনুমোদন প্রদান করছেন এই দুই কর্মকর্তা। তদুপরি, চালকদের ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে ভিত্তিহীন উপাত্ত ও দ্বাদশ অঙ্কের ভুয়া মুঠোফোন নম্বর সংবলিত বানোয়াট মামলার স্লিপ।
জালিয়াতির চরম দৃষ্টান্তে দেখা যায়, টিআই শফিকের কার্যালয় সহায়ক এটিএসআই মাজহারুল এক সিএনজি চালকের বিরুদ্ধে এমন এক গায়েবি প্রতারণা মামলা রুজু করেছেন, যার তথাকথিত বাদী স্বয়ং অবগত নন যে তিনি কার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযান পরিচালনার নামে রাস্তায় আক্ষরিক অর্থেই ফাঁদ পাতা হচ্ছে। রেকারিং ফি হিসেবে প্রারম্ভে ৬০০ টাকা ধার্য করা হলেও, ট্রাফিক কার্যালয়ে তা ৩,৬০০ থেকে ৬,২০০ টাকায় উন্নীত হয়। এছাড়া, মেয়াদোত্তীর্ণ ট্যাক্স টোকেনের জন্য ৫,০০০ টাকা, ফিটনেসবিহীন যানের জন্য ১০,০০০ টাকা এবং লাইসেন্সের ত্রুটির কারণে ৫,০০০ টাকা জরিমানা করা হচ্ছে। অথচ বর্তমান সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী, ট্যাক্স টোকেনের মেয়াদ না থাকলে গাড়ি আটকের বা জরিমানার কোনো বিধান নেই। কাগজ সংশোধনের ন্যূনতম অবকাশ না দিয়েই এই সীমাহীন জুলুমের ফলে প্রান্তিক চালকরা দিশেহারা হয়ে পড়ছেন।
এসএমপি-তে উপর্যুক্ত কর্মকর্তাদের বদলির আদেশ হলেও এক অদৃশ্য খুঁটির জোরে তারা স্বীয় পদে বহাল তবিয়তে বিরাজমান। টিআই শফিক বদলির মাত্র এক মাসের মাথায় রহস্যজনকভাবে সিলেটে প্রত্যাবর্তন করেন। অন্যদিকে, সার্জেন্ট আসাদের ব্যাচমেটরা স্থানান্তরিত হলেও এবং নিজের বদলির নির্দেশনামা প্রাপ্তির পরও তিনি বদলি ঠেকিয়ে রেখেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক পুলিশ সদস্য নিশ্চিত করেছেন, ট্রাফিক পুলিশের অপারেটর কনস্টেবল হাবিবের মধ্যস্থতায় এই সম্পূর্ণ বেআইনি চক্রটি পরিচালিত হচ্ছে।
সরকারি চাকুরেদের নির্দিষ্ট সময়ান্তে বদলির নিয়ম থাকলেও এসএমপি ট্রাফিক বিভাগে তা উপেক্ষিত। ফলশ্রুতিতে, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের মতো পার্শ্ববর্তী জেলার পুলিশ সদস্যরা সিলেটে দীর্ঘকাল কর্মরত থাকার সুবাদে এখানকার অলিগলির সাথে পরিচিত হয়ে নানাবিধ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ সম্প্রতি মোগলাবাজারে ইয়াবাসহ ধৃত পুলিশ সদস্য রুবেল।
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত টিআই শফিক ও সার্জেন্ট আসাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা সাড়া দেননি। অনতিবিলম্বে এই দুর্নীতির মূলোৎপাটন করে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের ক্ষুণ্ণ হওয়া ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে পুলিশ কমিশনারের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন সচেতন মহল।