বিশেষ প্রতিবেদক: সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার পশ্চিম জাফলং ইউনিয়ন এখন অপরাধীদের এক নিরাপদ অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। আর এই অপরাধ সাম্রাজ্যের মূল নিয়ন্ত্রক খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক কর্মকর্তা। বিট অফিসার ও থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) গোলাম ফাত্তাহর প্রত্যক্ষ ছত্রচ্ছায়ায় গোটা ইউনিয়নজুড়ে চলছে ভারতীয় চোরাচালান, নারী পাচার এবং বালু-পাথরবাহী ট্রাক থেকে দৈনিক লাখ লাখ টাকার বেপরোয়া চাঁদাবাজি। অভিযোগ উঠেছে, এই বিশাল অবৈধ আয়ের একটি বড় অংশ সরাসরি চলে যাচ্ছে গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) পকেটে।
সরেজমিন অনুসন্ধান ও স্থানীয় একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, সীমান্তবর্তী পশ্চিম জাফলং ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরেই অপরাধীদের নিরাপদ রুট। তবে এসআই গোলাম ফাত্তাহ বিট অফিসার হিসেবে যোগদানের পর থেকে এই এলাকার চোরাকারবারি ও মানবপাচারকারী সিন্ডিকেট যেন আলাদিনের চেরাগ পেয়েছে।
চাঁদাবাজির মহোৎসব জানা যায়, পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে চলাচলকারী বালু ও পাথরবোঝাই ট্রাকগুলো যেন পুলিশের ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’। এসআই ফাত্তাহর ইশারায় ওসির নাম ভাঙিয়ে একটি স্থানীয় প্রভাবশালী সিন্ডিকেট প্রতিদিন নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে এসব ট্রাক থেকে প্রকাশ্যে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করছে। চাঁদাবাজির এই পুরো নেটওয়ার্কের নাটাই মূলত এসআই ফাত্তাহর হাতেই বন্দি।
মাদক, অস্ত্র ও নারী পাচারের ভয়ংকর রুট শুধু চাঁদাবাজি নয়, এই ইউনিয়ন এখন ভয়ংকর সব আন্তঃসীমান্ত অপরাধের রুট। বিট এলাকার বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে স্রোতের মতো দেশে ঢুকছে ভারতীয় মাদক, অস্ত্রসহ নানাবিধ চোরাই পণ্য। অভিযোগ রয়েছে, এসব পণ্য নির্বিঘ্নে সিলেটের বাজারসহ সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে প্রতিটি চালানের ওপর নির্দিষ্ট হারে ‘ভাগ’ দিতে হয় এসআই ফাত্তাহকে। ওসির নাম করে নেওয়া এই বখরার টাকা পরিশোধ করলেই চোরাকারবারিদের জন্য সব রাস্তা উন্মুক্ত।
সবচেয়ে লোমহর্ষক অভিযোগটি হলো মানবপাচারের। এ ইউনিয়নের পান্তুমাইসহ বেশ কয়েকটি সীমান্ত পথ ব্যবহার করে বাংলাদেশ থেকে নারী পাচার করছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। এলাকাবাসীর গুরুতর অভিযোগ, এই মানবপাচার সিন্ডিকেটের নেপথ্য নিয়ন্ত্রকও খোদ এসআই ফাত্তাহ। পুলিশের প্রত্যক্ষ মদদ ও রহস্যজনক নীরবতার কারণেই মানবপাচারকারীর মতো জঘন্য অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
প্রশ্ন উঠেছে, একজন এসআই কীভাবে এত বড় অপরাধ সাম্রাজ্য গড়ে তুললেন? স্থানীয়দের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া থেকে এর উত্তর মেলে। তারা জানান, এই অবৈধ বাণিজ্যের কোটি কোটি টাকার ভাগবাটোয়ারা শুধু এসআই পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই। ফাত্তাহর হাত ঘুরে এই কালো টাকার একটি বড় অংশ নিয়মিত পৌঁছে যাচ্ছে গোয়াইনঘাট থানার শীর্ষ মহলে। বিশেষ করে এসআই ফাত্তাহর মারফতে অপরাধ ও অপকর্মে অর্জিত অবৈধ টাকার একটি মোটা অংশ সরাসরি গোয়াইনঘাট থানার ওসির টেবিলে পৌঁছে যায় বলে এলাকায় চাউর রয়েছে।
পুলিশের এমন লাগামহীন দুর্নীতি ও দায়িত্বহীনতার কারণে পশ্চিম জাফলং এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে তীব্র আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা। সচেতন মহল অবিলম্বে এসআই গোলাম ফাত্তাহ এবং থানার ওসির সন্দেহজনক ভূমিকা খতিয়ে দেখে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে, পাহাড়সম এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত এসআই গোলাম ফাত্তাহ এবং গোয়াইনঘাট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ওমর ফারুকের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এখন দেখার বিষয়, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এই দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের লাগাম টানতে কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।