মোঃ রায়হান হোসেন: গুরুতর দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও চোরাচালান সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকার পরও অদৃশ্য শক্তির জোরে বহাল তবিয়তে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন দুর্নীতির মহারাজা পুলিশ কর্মকর্তা সজল কুমার কানু।শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে এর আগে তাকে দুর্নীতির দায়ে কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি থেকে প্রত্যাহার (ক্লোজ) করা হলেও, রহস্যজনকভাবে তিনি সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার লালপুর নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (আইসি) পদ বাগিয়ে নিয়েছেন। বর্তমানে তার ছত্রছায়ায় সুরমা ও রক্তি নদী পরিণত হয়েছে চাঁদাবাজি ও শোষণের এক ভয়াল অভয়ারণ্যে। সম্প্রতি তার ‘মাসোহারা বাণিজ্যের’ ২৬ জন এজেন্টের নাম ও মোবাইল নম্বর সম্বলিত একটি গোপন নথি ফাঁস হওয়ায় প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
ফাঁস হওয়া দালিলিক প্রমাণ বলছে, নদীপথের বৈধ-অবৈধ এমন কোনো খাত নেই, যেখানে আইসি সজলের কালো থাবা পড়েনি। তার আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে অবৈধ ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে তৌফিক মিয়া, কুদ্দুস, রফিক, আবু বক্কর ও শাহজাহান। হান্নান, ফয়জুনূর, জয়নাল ও মোস্তফাদের মতো চোরাকারবারিরা সরাসরি পুলিশের মদদে গড়ে তুলেছে ভারতীয় পণ্যের বিশাল চোরাচালান নেটওয়ার্ক।
চাঁদাবাজির এই নির্মম শিকার থেকে রেহাই পাচ্ছে না গরুর বাজার কিংবা সাধারণ মাঝিরাও। কাসেম মোল্লা, কালা, তাজুল ও জাকিরের মাধ্যমে ট্রলার ঘাট, বাল্কহেড ও জিকজাগ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। এর চেয়েও ভয়ংকর বিষয় হলো, আইসি সজলের মদদপুষ্ট হয়ে দুর্লভপুরের কাঁচা মেম্বার এবং সোহাগ সরকারি সংস্থা বিআইডব্লিউটিএ (BIWTA)-এর নাম ভাঙিয়ে সাধারণ নৌ-যান থেকে প্রকাশ্য চাঁদাবাজি করছে। সুরমা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে শ্রাবন্তী হিজরা, রুস্তম আলী ও শুক্কুর আলীরা কায়েম করেছে ত্রাসের রাজত্ব।
দেশীয় মৎস্য সম্পদের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ ‘চায়না দুয়ারী’ জালের অবৈধ কারবারও চলছে এই পুলিশ কর্মকর্তার নির্দেশে। রাসেল নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে এই খাত থেকে নিয়মিত বখরা ফাঁড়িতে পৌঁছে যায়। গত আগস্ট মাসের একটি ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, পাচারের সময় বস্তাবন্দি নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারী জাল পুলিশ ফোর্স আটক করলেও, আইসি সজলের নির্দেশে তা ছেড়ে দেওয়া হয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, লালপুর নৌ-পুলিশ ফাঁড়িতে এক বছরের বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করলেও মাসোহারা চুক্তির কারণে তার আওতাধীন এলাকায় একটিও চায়না দুয়ারী জাল আটকের মামলা রেকর্ড হয়নি।
সজল কুমার কানুর এই বেপরোয়া দুর্নীতির ইতিহাস নতুন নয়। ২০২০ সালের এপ্রিলে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি থাকাকালীন অবৈধ পাথর উত্তোলন এবং ভারতীয় গরু পাচারকারীদের সহযোগিতার গুরুতর অভিযোগে তাকে ক্লোজ করা হয়েছিল। কিন্তু সেই কলঙ্কিত অতীত থাকা সত্ত্বেও তিনি কীভাবে নতুন করে নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ হলেন, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্নের জন্ম নিয়েছে। সম্প্রতি দেশের শীর্ষ গণমাধ্যমগুলোতে তার বেপরোয়া দুর্নীতি নিয়ে একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ফাঁস হয়েছে চাঁদাবাজদের নাম, গ্রাম, খাতের বিবরণসহ অকাট্য প্রমাণ। এত কিছুর পরও দুর্নীতির এই বরপুত্রকে তার পদ থেকে সরানো হয়নি।
সচেতন মহলের এখন একটাই প্রশ্ন? এই অকাট্য প্রমাণের পর ঊর্ধ্বতন পুলিশ প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কেন নীরব? সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষকে এই প্রাতিষ্ঠানিক শোষণের হাত থেকে বাঁচাতে অবিলম্বে এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও অভিযুক্ত সজল কানুর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
উল্লেখ্য, এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত আইসি সজল কুমার কানুর ব্যবহৃত মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
ধারাবাহিক পর্ব নং-০৭।