মোঃ রায়হান হোসেন: পুলিশ প্রশাসনে ‘বদলি’ কিংবা ‘প্রত্যাহার’কে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, কিছু বিতর্কিত কর্মকর্তার ক্ষেত্রে তা যেন স্রেফ এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে ‘নিরাপদ পুনর্বাসন’ বা পুরষ্কারে রূপ নিয়েছে। অনৈতিক লেনদেন, ঘুষ বাণিজ্য এবং পেশাগত অসদাচরণের গুরুতর অভিযোগে বারবার প্রত্যাহার হওয়া অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. শাহিন মিয়াকে এবার সুনামগঞ্জ জেলার বিশ্বম্ভরপুর থানার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। গত ৪ জুন তার এই নতুন যোগদানের পর থেকেই জেলা পুলিশের অভ্যন্তরীণ মহল এবং স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজের মাঝে চরম ক্ষোভ ও তীব্র সমালোচনার ঝড় উঠেছে।
ভৈরব থেকে মাগুরা: ঘুষ কেলেঙ্কারির অন্তহীন খতিয়ান: ওসি শাহিন মিয়ার বিরুদ্ধে অনৈতিক আর্থিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ নতুন কিছু নয়। ইতিপূর্বে কিশোরগঞ্জের ভৈরব থানায় থাকাকালীন এক আসামিকে ছেড়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ৬০ হাজার টাকা ঘুষ গ্রহণের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। ঘুষ নেওয়ার পরও আসামিকে আদালতে চালান করে দিলে বিষয়টি জানাজানি হয়। পরবর্তীতে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের হস্তক্ষেপ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র সমালোচনার মুখে তিনি ৫৯ হাজার টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হন। তৎকালীন কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপারের নির্দেশে ভৈরব সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার তদন্ত করে এই ঘুষ গ্রহণের বিষয়টি দালিলিক ও প্রামাণ্যভাবে প্রমাণ করেন। কিন্তু এক ‘অদৃশ্য খুঁটির জোরে’ তার বিরুদ্ধে কোনো কঠোর বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো তাকে মাগুরা জেলার শ্রীপুর থানায় অফিসার ইনচার্জ হিসেবে পদায়ন করা হয়।
পুরনো অভ্যাস ও মাগুরা থেকে প্রত্যাহার: গত বছরের ৭ ডিসেম্বর শ্রীপুর থানার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই ওসি শাহিন মিয়া আবারও পুরনো অভ্যাসে লিপ্ত হন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও অপরাধী গোষ্ঠীর কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করে সাধারণ মানুষকে আইনি সেবা থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। অপরাধীদের ঢাল হয়ে দাঁড়ানো এবং ঘুষ বাণিজ্যের বিষয়টি মাগুরার নবাগত পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেনের দৃষ্টিগোচর হলে তিনি বিষয়টি গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করেন। অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা মেলায় গত মঙ্গলবার এক আদেশে ওসি শাহিন মিয়াকে শ্রীপুর থানা থেকে প্রত্যাহার করে মাগুরা পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়।
‘অদৃশ্য শক্তি’র জোরে অলৌকিক পুরষ্কার: মাগুরা পুলিশ লাইনে সংযুক্ত হওয়ার পর সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী যেখানে বিভাগীয় তদন্ত ও কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার কথা, সেখানে সমস্ত নিয়ম-নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অলৌকিকভাবে ৪ জুনের মধ্যে সিলেট বিভাগের সীমান্তবর্তী ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জেলা সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর থানার ওসি হিসেবে বহাল তবিয়তে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন শাহিন মিয়া। ঘুষখোর এবং পরপর দুই থানা থেকে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে বিতর্কিতভাবে প্রত্যাহার হওয়া এই কর্মকর্তা কোন প্রশাসনিক যোগ্যতায় বা কার ইশারায় বারবার পার পেয়ে যাচ্ছেন এবং পুনরায় থানার মতো জনগুরুত্বপূর্ণ ইউনিটের প্রধানের চেয়ার বাগিয়ে নিচ্ছেন—তা নিয়ে খোদ পুলিশ বিভাগের ভেতরেই তৈরি হয়েছে চরম অসন্তোষ।
মাঠপর্যায়ে ক্ষোভ, ভেঙে পড়ছে সততার মনোবল: এই বিতর্কিত যোগদানের ফলে সুনামগঞ্জ জেলা পুলিশের ভেতরে তীব্র অসন্তোষ ও চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। সৎ ও নিষ্ঠাবান কর্মকর্তাদের দাবি, এ ধরনের কলঙ্কিত কর্মকর্তাদের বারবার পুরস্কৃত করার মাধ্যমে পুলিশের সামগ্রিক ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং মাঠ পর্যায়ের সৎ অফিসারদের মনোবল ভেঙে যাচ্ছে। স্থানীয় সুশীল সমাজের মতে, প্রশাসনের এই ‘বদলি-খেলা’ এবং অপরাধী কর্মকর্তাদের প্রতি নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও সাধারণ মানুষের কাছে পুলিশের বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অন্তরায়। অপরাধ দমনের দায়িত্বে থাকা একজন কর্মকর্তা নিজেই যখন বারবার অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ও প্রমাণিত, তখন তাকে কার ইশারায় বারবার দায়মুক্ত করে পুরস্কৃত করা হচ্ছে—সেই ‘অদৃশ্য শক্তি’র উৎস খোঁজা এখন সময়ের দাবি।
Leave a Reply