বিশেষ প্রতিবেদন: সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) এয়ারপোর্ট থানায় দীর্ঘ দেড় বছর ধরে ঘাপটি মেরে থাকা বিতর্কিত উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ সরওয়ার্দীর বিরুদ্ধে একের পর এক চোরাই পণ্য আত্মসাৎ, প্রকাশ্য ঘুষ বাণিজ্য এবং মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে চিহ্নিত চোরাকারবারিকে রাস্তা থেকে ছেড়ে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
লুসাইন গ্রামের আলোচিত ‘৬০ বস্তা ভারতীয় জিরা আত্মসাৎ’ কাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার পাটানগাঁওয়ে ভারতীয় টমেটোর চালান আটকে ঘুষ লেনদেন করতে গিয়ে স্থানীয় জনতার তোপের মুখে পড়েছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। ওসি শহিদুর রহমান ও এসআই বিধানের ছত্রছায়ায় এসআই সরওয়ার্দীর এমন বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে পুরো পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত আগস্ট মাসে এয়ারপোর্ট থানাধীন লুসাইন গ্রামের সফিক মিয়ার ছেলে কামালের বসতঘরে ভারতীয় চোরাচালানের ৬০ বস্তা অবৈধ জিরা মজুতের সন্ধান পেয়ে অভিযান চালান এসআই মোহাম্মদ সরওয়ার্দী। কিন্তু আইনের রক্ষক হয়েও অভিযান চলাকালে কতিপয় অসাধু রাজনীতিবিদ ও চোরাকারবারিদের সাথে ওসি শহিদুর রহমানের মাধ্যমে মোটা অংকের আর্থিক রফাদফায় জড়িয়ে পড়েন তিনি।
ওসির প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় এসআই সরওয়ার্দী সেখানে নজিরবিহীন এক নাটকের জন্ম দেন। ৬০ বস্তার মধ্যে কেবল লোকদেখানো ৫ বস্তা জিরা জব্দ দেখিয়ে থানায় নিয়ে আসেন এবং বাকি ৫৫ বস্তা জিরা পরদিন থানায় হস্তান্তর করা হবে, এমন এক হাস্যকর আশ্বাসে অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করেন। কিন্তু পরবর্তীতে কালো টাকার বিনিময়ে সেই ৫৫ বস্তা জিরা যেমন থানায় আসেনি, তেমনি জব্দকৃত ৫ বস্তা জিরার বিষয়েও কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ওসির সাথে আঁতাত করে এসআই সরওয়ার্দী পুরো ৬০ বস্তা জিরার চালানটিই রীতিমতো ‘হজম’ করে ফেলেছেন। চাঞ্চল্যকর এই জিরা আত্মসাৎ কাণ্ডের ভিডিওসহ অকাট্য তথ্য-প্রমাণ ইতোমধ্যে ‘তদন্ত রিপোর্ট’ কার্যালয়ে সংরক্ষিত রয়েছে।
জিরা আত্মসাতের বিষয়ে গত শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিকেলে এক সংবাদকর্মী এসআই মোহাম্মদ সরওয়ার্দীর সাথে যোগাযোগ করলে তিনি চরম অসংলগ্ন ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য প্রদান করেন। প্রথমে তিনি জিরা সংক্রান্ত কোনো অভিযানের কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। পরক্ষণেই আবার সুর পাল্টে বলেন, গোপন তথ্যে এক বসতঘরে জিরা খুঁজতে গিয়ে কিছু পাননি। আবার মুহূর্তের মধ্যেই নিজের বক্তব্য ঘুরিয়ে দাবি করেন, ‘বিলাশ’ নামের এক ব্যক্তির হারানো জিরা উদ্ধার করতে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন! প্রশ্ন উঠেছে, চোরাই পণ্য জব্দ করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার বদলে চোরাকারবারির ‘হারানো মাল’ উদ্ধার করে দেওয়া কি তবে এসআই সরওয়ার্দীর নতুন দায়িত্ব?
জিরা কাণ্ডের সমালোচনার মধ্যেই গত বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) দিবাগত রাত আনুমানিক ১টার দিকে পাটানগাঁও এলাকায় চেকপোস্টে নিজের দুর্নীতির আরেকটি নগ্ন রূপ প্রদর্শন করেন এসআই সরওয়ার্দী। এ সময় ১ লক্ষ ২৩ হাজার ২০০ টাকা মূল্যের ১,২৩২ কেজি (৫৬ ক্যারেট) অবৈধ ভারতীয় টমেটো ও একটি রেজিস্ট্রেশনবিহীন মিনি পিকআপ আটক করেন তিনি। ঘটনাস্থলেই গাড়ির চালক ও হেলপারের সাথে হাতেনাতে আটক হয় চোরাই মালের মূল মালিক এবং হরিপুর-এয়ারপোর্ট সড়কের পুলিশ লাইনের কথিত গডফাদার আনু মিয়া (পিতা- সুরু আলি, সাং- বনগাঁও কান্দিরপথ, সাহেবের বাজার)।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, আটক হওয়ার পরপরই ওসি শহিদুর রহমানের মৌখিক নির্দেশনায় মাত্র ৫ হাজার টাকা ঘুষের বিনিময়ে এসআই সরওয়ার্দী টমেটোভর্তি পিকআপ ও মূল হোতা আনু মিয়াসহ আটককৃতদের ছেড়ে দেওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতিকালে ফোনের কথাবার্তার বিষয়টি স্থানীয় জনগণের নজরে এলে তারা জড়ো হয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং মোবাইলে ভিডিও ধারণ শুরু করেন। এসআই সরওয়ার্দী ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ভিডিও ধারণে বাধা দিলে জনতা ফুঁসে ওঠে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে জনরোষ থেকে বাঁচতে এসআই সরওয়ার্দী বাধ্য হয়ে আনু মিয়া এবং চালক-হেলপারসহ মোট তিনজনকে থানামুখী নিয়ে যান বলে স্থানীয়রা জানায়।
কিন্তু চরম বিস্ময়কর বিষয় হলো, পরদিন এসএমপির মিডিয়া শাখা থেকে পাঠানো প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায়, এসআই সরওয়ার্দীর অভিযানের এ ঘটনায় দায়েরকৃত বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় (মামলা নং-৩১, তারিখ: ২২/১০/২০২৬) কেবল পিকআপের নিরীহ চালক গোয়াইনঘাটের মোঃ শায়েখ (২০) ও হেলপার জৈন্তাপুরের মোঃ হেলালকে (৪৫) গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে! অথচ জনতার সামনে থেকে আটক হওয়া মূল চোরাকারবারি আনু মিয়াকে মামলা থেকে বাদ দিয়ে রাস্তা থেকেই গায়েব করে দিয়েছেন এসআই সরওয়ার্দী। মূলত এয়ারপোর্ট থানার ওয়ারেন্ট অফিসার এসআই বিধানের আশীর্বাদপুষ্ট এই আনু মিয়া পুলিশের হয়ে চোরাচালানের গাড়ি থেকে ‘বখরা’ আদায় করে থাকে। তাই মোটা অংকের লেনদেনের মাধ্যমে তাকে ছেড়ে দিয়ে নিরীহ চালক ও হেলপারকে বলির পাঁঠা বানিয়েছেন এসআই সরওয়ার্দী। ওই রাতের ঘটনার সময়ে স্থানীয়দের ধারণকৃত স্থিরচিত্র যা এসআই সরওয়ার্দীর এই নির্লজ্জ জালিয়াতি ও আসামি গায়েব করার অকাট্য প্রমাণ বহন করে।
এয়ারপোর্ট থানাকে চোরাচালান সিন্ডিকেটের নিরাপদ আশ্রয়স্থল ও ঘুষ বাণিজ্যের আখড়ায় পরিণত করার মূল কারিগর হয়ে উঠেছেন এই এসআই মোহাম্মদ সরওয়ার্দী। ওসি শহিদুর রহমান এবং এসআই বিধানকে সাথে নিয়ে গড়ে তোলা তার এই ‘পুলিশি চোরাচালান সিন্ডিকেট’ এখন অপ্রতিরোধ্য। ৬০ বস্তা জিরা আত্মসাৎ এবং জনতার সামনে আটক চোরাকারবারিকে রাস্তা থেকে ছেড়ে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট প্রমাণের পরও থানার ওসি সহ এই দুই এসআইয়ের বিরুদ্ধে এসএমপির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা গ্রহণ করে? এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছে সচেতন সিলেটবাসী। অবিলম্বে এই দুর্নীতিবাজ এসআই সরওয়ার্দীসহ সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাহারপূর্বক বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি উঠেছে।