বিশেষ প্রতিবেদক: সিলেট-তামাবিল মহাসড়কের দরবস্ত বাজার পেরিয়ে চতুল বাজার থেকে বালিদাড়া পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় ৭ কিলোমিটারের সীমান্ত সড়ক। ভারত সীমান্তের ‘শূন্য লাইনে’ মিশে যাওয়া এই জনপদ এখন একচ্ছত্র অপরাধের সাম্রাজ্য। আর এই অলিখিত চোরাই সাম্রাজ্যের অধিপতি হিসেবে একক আধিপত্য বজায় রেখেছেন স্থানীয় চারিকাটা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতির পুত্র তথা সাবেক জেলা পরিষদ সদস্য মো. শাহজাহান। এক সময়ের সাধারণ লাকড়ি ব্যবসায়ী শাহজাহান বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে কয়েক বছরেই বনে গেছেন কোটি কোটি টাকার মালিক। বর্তমানে গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়েও তার এই বেপরোয়া চোরাচালান সিন্ডিকেট অপরিবর্তিত রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, জৈন্তাপুরের সীমান্তবর্তী লালাখাল চা-বাগান, বালিদাড়া ও খাইবাড়িমুখ এলাকাকে চোরাচালানের ‘ওপেন মার্কেট’ বা উন্মুক্ত বাজারে পরিণত করেছেন শাহজাহান। ভৌগোলিক দুর্গমতার কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান ব্যাহত হওয়ার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রতিদিন শত শত গাড়ি ভারতীয় চিনি, জিরা, চা পাতা, কসমেটিক্স, নাসির বিড়ি ও মদের চালান দেশে প্রবেশ করছে। সন্ধ্যা থেকে ভোররাত পর্যন্ত শাহজাহানের নিজস্ব ‘কিট বাহিনী’র কয়েকশ যুবক এই অবৈধ পণ্য পরিবহনে লিপ্ত থাকে।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর তথ্য হচ্ছে, গত বছরের ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের ঠিক পূর্বে ৩ ও ৪ঠা আগস্ট সিলেট নগরীতে আন্দোলনকারীদের দমনে যে বিপুল অস্ত্রের মহড়া দেওয়া হয়েছিল, তার সিংহভাগই শাহজাহানের হাত ধরে ভারত থেকে এসেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতাদের মদদে এই অস্ত্রের চালান সিলেটে পৌঁছানো হয়।
এদিকে শাহজাহানের এই বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। প্রতিদিন ১৫০-২০০টি পণ্যবাহী ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে চতুল থেকে বালিদাড়া পর্যন্ত সড়কটি সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে গত ১১ই মে সিলেটের পুলিশ সুপার বরাবর অর্ধশতাধিক স্থানীয় বাসিন্দা লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। স্থানীয় ভুক্তভোগী মো. হাবিবুল্লাহর ভাষ্যমতে, প্রতি বৃহস্পতিবার চতুল বাজারে নিজস্ব কার্যালয়ে বসে কর্মচারীদের মাঝে কোটি কোটি টাকা বিতরণ করেন শাহজাহান।
সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, চোরাচালানের বিরুদ্ধে জনরোষ তৈরি হওয়ায় গত মঙ্গলবার পার্শ্ববর্তী বড়বন্দ এলাকার একটি গোপন আস্তানায় চোরাকারবারিদের নিয়ে জরুরি বৈঠক করেছেন শাহজাহান। সেখানে প্রতিবাদকারীদের মিথ্যা মামলা ও আইনি মারপ্যাঁচে ফেলে হেনস্তা করার নীল নকশা তৈরি করা হয়েছে। চতুল বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. জনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘোষণা দিয়েছেন, চতুল বাজারের ভেতর দিয়ে কোনো ভারতীয় চোরাই পণ্য পরিবহন করতে দেওয়া হবে না। চারিকাটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুলতান করিমও এই যন্ত্রণায় ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, বিষয়টি আসন্ন জৈন্তাপুর উপজেলা মাসিক সমন্বয় সভায় গুরুত্বের সাথে উত্থাপন করা হবে।
অভিযোগের বিষয়ে মো. শাহজাহান চিনি চোরাচালানের সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে গণমাধ্যমে জানান, তিনি গত ৬ মাস ধরে এই ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন এবং ৫ই আগস্টের পূর্বে অস্ত্র কিংবা মাদক চোরাচালানের সাথে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।
তবে স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীদের দাবি, সীমান্তের এই মূল হোতাকে আইনের আওতায় এনে দ্রুত এই চোরাই রুট বন্ধ করা না হলে সীমান্তবর্তী নিরাপত্তা ও জনজীবন চরম হুমকিতে পড়বে।
Leave a Reply