জৈন্তার অন্ধকার জগৎ: ব্রয়লার সেলিমের অপরাধ সাম্রাজ্য! | তদন্ত রিপোর্ট

শনিবার, ২০ Jun ২০২৬, ০৫:১২ পূর্বাহ্ন

জৈন্তার অন্ধকার জগৎ: ব্রয়লার সেলিমের অপরাধ সাম্রাজ্য!

জৈন্তার অন্ধকার জগৎ: ব্রয়লার সেলিমের অপরাধ সাম্রাজ্য!

Manual5 Ad Code

সিলেট ব্যুরো: প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সিলেটের জৈন্তাপুর এখন চোরাচালান ও মাদক কারবারিদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর তৎপরতায় প্রতিনিয়ত কোটি কোটি টাকার ভারতীয় পণ্য ও মাদক জব্দ হলেও, এর নেপথ্যে থাকা গডফাদাররা থাকছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। এই অপরাধ জগতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন স্থানীয়ভাবে ‘ব্রয়লার সেলিম’ নামে পরিচিত সেলিম আহমেদ। রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তিনি গড়ে তুলেছেন এক শক্তিশালী চোরাচালান সিন্ডিকেট, যা বর্তমানে পুরো সীমান্ত এলাকার নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Manual6 Ad Code

অনুসন্ধানে জানা যায়, সেলিম আহমেদের অপরাধ সাম্রাজ্য রাতারাতি গড়ে ওঠেনি। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি নিজেকে স্থানীয় যুবদল নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে এলাকায় একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। যদিও স্থানীয় বিএনপি ও যুবদলের দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, সেলিমের সাথে দলের কোনো সাংগঠনিক সম্পর্ক নেই এবং তার কোনো পদপদবীও নেই। অভিযোগ রয়েছে, এই রাজনৈতিক তকমা ব্যবহার করে তিনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে বিভ্রান্ত করেন এবং সীমান্তে অবাধে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার একটি শক্তিশালী ‘আইনি ঢাল’ হিসেবে একে ব্যবহার করেন। রাজনীতির সমীকরণ পরিবর্তন হলেও তার কৌশলী অবস্থান ও স্থানীয় ক্ষমতাবান উপ-গ্রুপগুলোর সাথে গোপন আঁতাত তার অপরাধের রুটগুলোকে বছরের পর বছর সচল রেখেছে।

Manual4 Ad Code

সেলিমের ডাকনাম ‘ব্রয়লার সেলিম’ হলেও, তার অপরাধ সাম্রাজ্যের পরিধি এখন আর কেবল ব্রয়লার মুরগি বা চুনো মাছের চোরাচালানে সীমাবদ্ধ নেই। ভারত থেকে টেক্সটাইল, কসমেটিকস, উন্নতমানের স্মার্টফোন থেকে শুরু করে মরণনেশা মাদক—সবই এখন তার সিন্ডিকেটের হাত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। তার এই সাম্রাজ্য অত্যন্ত সুসংগঠিত ‘চেইন অব কমান্ড’ মেনে চলে। নিজে সরাসরি মাঠে না থেকে তিনি গড়ে তুলেছেন একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। সেলিমের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড। সরকারি অনুমতি ছাড়াই জৈন্তাপুর মিনি স্টেডিয়ামের দ্বিতীয় তলাকে তিনি নিজের আস্তানা বানিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, স্টেডিয়াম এলাকাকে তিনি মাদক বিক্রির সেফ জোনে পরিণত করেছেন, যেখানে বুপ্রেনরফিন ইনজেকশন, ইয়াবা ও হেরোইনের মাধ্যমে স্থানীয় যুবসমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন।

সেলিমের অর্থের যোগানে ভারত থেকে আসা ইয়াবা, ফেনসিডিল এবং ভয়ঙ্কর মাদক আইস (ক্রিস্টাল মেথ) সিলেটের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেওয়ার মূল কারিগর এই জেবু। সেলিমের গোডাউন পাহারা দেওয়া, প্রশাসনের গতিবিধির ওপর নজর রাখা এবং ‘লাইনম্যান’ হিসেবে কাজ করে এই চক্রটি। জৈন্তাপুরের ভৌগোলিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে সেলিম ও তার সহযোগীরা ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ডাউকি ও খাসিয়া পুঞ্জির চোরাকারবারিদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ রক্ষা করে। ওপার থেকে গ্রিন সিগন্যাল পাওয়ার পরপরই ডিবির হাওর, ফুলবাড়ী, টিপরাখলা সংলগ্ন পাহাড়ি ছড়া ও সীমান্ত নদীগুলোকে রুট হিসেবে ব্যবহার করে মালামাল বাংলাদেশে পুশ করা হয়। বর্ষাকালে নৌকা এবং শীতকালে দুর্গম পাহাড়ি পথ ব্যবহার করে চোরাকারবারিরা অত্যন্ত চতুরতার সাথে চালানগুলো গন্তব্যে পৌঁছায়।

সম্প্রতি ফতেহপুর ইউনিয়নের হরিপুর বালীপাড়া এলাকায় ৭৫ বস্তা ভারতীয় জিরা উদ্ধারের ঘটনাটি সেলিমের সিন্ডিকেটের বিশাল কর্মযজ্ঞের প্রমাণ দেয়। একের পর এক পণ্য জব্দ হলেও, এর পেছনের মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনতে না পারায় জনমনে চরম হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সচেতন মহলের মতে, যতক্ষণ পর্যন্ত রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা এসব গডফাদারদের আইনের মুখোমুখি করা না হবে, ততক্ষণ জৈন্তাপুরকে মাদক ও চোরাচালানমুক্ত করা সম্ভব নয়। স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধের গভীরতাকে বিবেচনায় নিয়ে এই সিন্ডিকেটের শেকড় উপড়ে ফেলতে হবে। অন্যথায়, সীমান্তবর্তী এই শান্ত জনপদটি খুব শীঘ্রই এক ভয়াবহ সামাজিক বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হবে।

Manual5 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Add



© All rights reserved © tadantareport.com
Design BY Web WORK BD
ThemesBazar-Jowfhowo
Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code
error: Content is protected !!