নিজস্ব প্রতিবেদক, সিলেট: পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সিলেটে চরমমনিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়েছেন ‘জাতীয় সাপ্তাহিক তদন্ত রিপোর্ট’ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মো. রায়হান হোসেন। থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পরও পুলিশের নাকের ডগা দিয়ে একদল সশস্ত্র ও পেশাদার সন্ত্রাসী রাতের অন্ধকারে এই সাংবাদিককে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে। পরবর্তীতে কুমিল্লার দেবিদ্বারে সাহসিকতার সাথে তিনি অপহরণকারীদের কবল থেকে পালিয়ে প্রাণে রক্ষা পান। এই ন্যক্কারজনক ঘটনায় সিলেটের শাহপরান (রহ.) থানায় একটি নিয়মিত মামলা (এজাহার) দায়ের করেছেন ভুক্তভোগী সাংবাদিক।
এজাহার সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে পেশাগত দায়িত্ব পালন ও দুর্নীতির খবর প্রকাশ করায় স্থানীয় একটি চিহ্নিত সন্ত্রাসী চক্র সাংবাদিক রায়হানের ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। এর জের ধরে গত ৩ জুলাই, ২০২৬ তারিখে জুমার নামাজের পর আক্তার হোসেন নামের এক সন্ত্রাসী রায়হানের ৬ বছরের শিশু সন্তানের পথরোধ করে প্রকাশ্যে গালিগালাজ করে। রায়হানের মামাতো ভাই এর প্রতিবাদ করলে আসামীরা চরম ঔদ্ধত্য দেখিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে হুমকি দেয় যে, “সাংবাদিক রায়হানকে তো খুন করবই, সেই সাথে তার তিন সন্তানের মধ্যে যেকোন শিশুকে অপহরণ করে খুন করে লাশ গুম করে ফেলবো।”।
এই নজিরবিহীন হুমকির পর চরম আতঙ্কিত হয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অবহিত করে গত ৪ জুলাই শাহপরান (রহ.) থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি-১৪৬) দায়ের করেন সাংবাদিক রায়হান মা। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, থানায় জিডি হওয়া সত্ত্বেও আইনের প্রতি চূড়ান্ত বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে অপরাধী চক্র তাদের পূর্বপরিকল্পিত হত্যার ছক বাস্তবায়নে মরিয়া হয়ে ওঠে।
জিডি দায়েরের মাত্র কয়েকদিনের মাথায়, গত ৭ জুলাই দিবাগত রাত আনুমানিক ১:৩৭ মিনিটে অজ্ঞাত নাম্বার হইতে আসামীরা সুকৌশলে জরুরি আলাপের কথা বলে রায়হানকে ফোন করে বাড়ির বাইরে ডেকে নেয়। সরল বিশ্বাসে তিনি বাইরে আসামাত্রই আগে থেকে ওঁত পেতে থাকা ১নং আসামী আক্তারসহ ৩/৪ জন অজ্ঞাতনামা সশস্ত্র সন্ত্রাসী তাকে ঘিরে ফেলে। তারা বেআইনি জনতাবদ্ধে পেশিশক্তির মহড়া দিয়ে, চরম ত্রাস সৃষ্টি করে এবং প্রাণনাশের ভয়ভীতি দেখিয়ে রায়হানকে জোরপূর্বক একটি অজ্ঞাত গাড়িতে তুলে অপহরণ করে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে চলতে থাকে।
অপহরণকারী চক্রটি রাত গড়িয়ে ভোরে কুমিল্লার দেবিদ্বার থানাধীন ‘চরবাকর’ নামক স্থানে পৌঁছালে চা-নাস্তা গ্রহণের জন্য গাড়ি থামায়। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সাংবাদিক রায়হান জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে অত্যন্ত সাহসিকতা ও সতর্কতার সাথে তাদের বেষ্টনী থেকে নিজেকে মুক্ত করে গাড়ি থেকে পালাতে সক্ষম হন। এরপর স্থানীয় এক বাসিন্দার সহায়তায় তিনি তাৎক্ষণিক নিকটবর্তী দেবিদ্বার থানা পুলিশের শরণাপন্ন হয়ে নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ করেন। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে অপহরণকারীরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি এবং থানায় জিডি থাকার পরও একজন সাংবাদিককে এভাবে সশস্ত্র অপহরণের ঘটনা প্রমাণ করে যে, এই সন্ত্রাসী চক্রটি কতটা বেপরোয়া এবং আইনকে তারা কতটা তোয়াক্কা করে না। বর্তমানে প্রাণে রক্ষা পেলেও আসামীদের এমন দুর্ধর্ষ, বেআইনি ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ কর্মকাণ্ডের দরুন সাংবাদিক রায়হান ও তার পরিবার চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায় দিনাতিপাত করছেন। গত ৮ জুলাই ২০২৬ তারিখে তিনি শাহপরান (রহ.) থানায় ১। আকতার হোসেন (৩৭), সহ অজ্ঞাতনামা আরও ৩/৪ জন সশস্ত্র সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে এজাহার দায়ের করেছেন।
একটি স্বাধীন দেশে একজন গণমাধ্যমকর্মীর ওপর এমন বর্বরোচিত হামলা স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশের ওপর চরম আঘাত। অবিলম্বে এই ঘটনার সাথে জড়িতদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন সুশীল সমাজ ও সাংবাদিক মহল। প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এই সন্ত্রাসী চক্র যেকোনো সময় সাংবাদিক রায়হান বা তার পরিবারের ওপর পুনরায় সশস্ত্র হামলা চালিয়ে প্রাণনাশের ব্লু-প্রিন্ট বাস্তবায়ন করতে পারে বলে প্রবল আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে দেবিদ্বার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের সরকারি নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, “ঘটনার সময় আমি থানায় উপস্থিত ছিলাম না। তবে আমি অবহিত হয়েছি যে, একটি সংঘবদ্ধ অপহরণকারী চক্র সিলেট থেকে ওই সংবাদকর্মীকে অপহরণ করে নিয়ে আসছিল। পথিমধ্যে দেবিদ্বার থানা এলাকায় তারা গাড়ি থামালে অপহৃত সাংবাদিক সুকৌশলে পালিয়ে যান এবং নিকটস্থ একটি সিএনজি স্ট্যান্ডে আশ্রয় গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে স্থানীয়দের সহায়তায় পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে থানা হেফাজতে নিয়ে আসে।” মামলার এখতিয়ার প্রসঙ্গে ওসি আরও বলেন, “যেহেতু অপহরণের মূল ঘটনাস্থল সিলেটের শাহপরাণ থানা এলাকার অধীন, তাই আইনি বিধান মোতাবেক মামলা সেখানেই দায়ের করতে হবে। তা সত্ত্বেও, দেবিদ্বার থানা পুলিশের পক্ষ থেকে যথাযথ নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ওই সংবাদকর্মীকে নিরাপদে সিলেটে পৌঁছানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।”
শাহপরান (রহ.) থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) দাপ্তরিক নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তার ছুটিতে থাকার বিষয়টি অবগত হওয়া যায়। তবে, অভিযোগ প্রাপ্তির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মনজুরুর রহমান। গণমাধ্যমের কাছে প্রদত্ত বক্তব্যে তিনি জানান, গতকাল সার্ভার ত্রুটির কারণে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি; তবে আজ বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিয়ে নিবিড়ভাবে আইনি কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।”
Leave a Reply