মোঃ রায়হান হোসেন: সিলেটের পুণ্যভূমি হযরত শাহপরাণ (রহ.) দরগাহ ওয়াকফ এস্টেটে (ইসি নং-১৩৬৫১) চলছে লাগামহীন অনিয়ম ও হরিলুট! ভক্তদের দেওয়া কোটি টাকার নজরানা আত্মসাৎ, হিসাবের গোপনীয়তা, সম্পত্তির অবৈধ দখল এবং মোতাওয়াল্লী পদের বৈধতা নিয়ে এবার চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে।
দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে চলা এই লুটপাটের বিরুদ্ধে সম্প্রতি ৩২৬ পৃষ্ঠার প্রামাণ্য নথিসহ ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দাখিল করা হলেও, আমলাতান্ত্রিক ‘চিঠি চালাচালি’র গোলকধাঁধায় থমকে আছে বিচার প্রক্রিয়া।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর (২০২৬) শাহপরাণ আবাসিক এলাকার বাসিন্দা মো. আমিরুল ইসলাম ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক ও তদন্তকারী কর্মকর্তা বরাবর বর্তমান মোতাওয়াল্লী সৈয়দ মামুনুর রশীদের বিরুদ্ধে একটি বিশদ অভিযোগ দায়ের করেন।
হাইকোর্টের রিট পিটিশন (নং-৬৪৮৬/২০১৪)-এর নথি থেকে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে— ১৯৯৮ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর সৈয়দ মামুনুর রশীদ মোতাওয়াল্লী পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। রহস্যজনকভাবে সেই পদত্যাগের পরও কোন জালিয়াতি বা অদৃশ্য শক্তির ইশারায় তিনি পুনরায় ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছেন, তা প্রশাসনের ওয়াকফ রেকর্ডে কঠোরভাবে খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
প্রতিদিন হাজার হাজার ভক্ত ও আশেকানদের পদচারণায় মুখরিত থাকে শাহপরাণ মাজার। অথচ ওয়াকফ পরিদর্শক ও হিসাব নিরীক্ষকের দপ্তরে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের আয় দেখানো হয়েছে মাত্র ৫৪ লাখ ৫৫ হাজার ৪৬৫ টাকা! এই অঙ্ককে ‘হাস্যকর ও চরম অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন সচেতন এলাকাবাসী।
দরগাহর দানবাক্স (সিন্দুক), মানত, নজরানা, দোকান ও স্থাপনা ভাড়া এবং ব্যাংকিং লেনদেনের প্রকৃত হিসাব গোপন করে কোটি কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনে বিশেষ অডিট এবং সিন্দুক খোলার সময়কার রেজিস্টার, সিসিটিভি ফুটেজ ও চালানের কঠোর ফরেনসিক তদন্ত এখন সময়ের দাবি।
কেবল অর্থ লুটপাট নয়, দরগাহ এস্টেটের মূল্যবান জমি ও স্থাপনা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে লিজ বাণিজ্য ও অবৈধ দখলদারদের হাতে তুলে দেওয়ার বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। এর আগে ২০১০ সালের ৪ অক্টোবর দরগাহর মূল্যবান সেগুন গাছ কেটে নেওয়ার যে ঘটনা ঘটেছিল, তার ধামাচাপা পড়া পুরনো তদন্ত নথিও এবার নতুন করে সামনে আনা হয়েছে।
মাজারের অনিয়ম নিয়ে গত দেড় যুগ ধরে স্থানীয় ওয়াকফ ও জেলা প্রশাসক (ডিসি) কার্যালয়ে অভিযোগ জানিয়ে আসছেন এলাকাবাসী। কিন্তু প্রতিকারের বদলে শুরু হয় এক অদ্ভুত ‘চিঠি খেলা’। স্থানীয় ওয়াকফ অফিস থেকে চিঠি যায় ঢাকার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে, ঢাকা থেকে আবার তদন্তের নির্দেশে তা ফেরে সিলেট ডিসি অফিসে। এরপর ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালকের মাধ্যমে গণশুনানি শেষে রিপোর্ট পুনরায় ঢাকায় পাঠানোর অন্তহীন প্রক্রিয়া চলতে থাকে। দীর্ঘদিনের এই দীর্ঘসূত্রিতায় ওয়াকফ অফিসে মাজারের ফাইলের ওজন এখন প্রায় ১০ কেজি ছুঁয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ঢাকার ওয়াকফ অফিসে প্রভাবশালী ‘মামুন রশিদ চক্র’ মোটা অঙ্কের টাকা ঢেলে দালাল বসিয়ে রেখেছে। যার কারণে প্রতিবারই অভিযোগ জমা পড়ে, কিন্তু ফাইল আর আলোর মুখ দেখে না। প্রশাসনিক এই বাহানার ফাঁকে লুটেরাদের পকেট ভারী হচ্ছে, আর অপমানিত হচ্ছে সাধারণ মানুষের ভক্তি।
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে মোতাওয়াল্লী সৈয়দ মামুনুর রশীদের বক্তব্য জানতে সরাসরি যোগাযোগ করা হলে জানা যায়, তিনি অসুস্থ হয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রবাসে রয়েছেন। তার ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে অভিযোগের সারাংশ পাঠিয়ে বক্তব্য চাওয়া হলেও কোনো সাড়া মেলেনি।
লুটপাট ও পরিবারতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে মাজারের পবিত্রতা রক্ষায় জেলা প্রশাসককে সভাপতি, পুলিশ কমিশনারকে সহ-সভাপতি এবং ইউএনও, ওয়াকফ পরিদর্শক, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালকসহ স্থানীয় প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ২৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক পরিচালনা কমিটি গঠনের জোরালো দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সচেতন মহলের একটাই প্রশ্ন, আমলাতন্ত্রের এই নাটক আর কতদিন চলবে? সাধারণ মানুষের ভক্তির আমানত রক্ষায় তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ কি কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করবে, নাকি ‘চিঠির স্তূপে’ আবারও চাপা পড়বে ন্যায়বিচার?