গোয়াইনঘাট সংবাদদাতা: সিলেট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের নির্দেশনাক্রমে গঠিত তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও বালাগঞ্জ উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মাহমুদুল হাসানের নেতৃত্বে গোয়াইনঘাট আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক সালিকুর রহমানের বিরুদ্ধে আনীত যৌন নিপীড়ন, শ্লীলতাহানি এবং শিষ্টাচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের আনুষ্ঠানিক তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে।
গতকাল সোমবার (১৭ আগস্ট) সকাল ১১ ঘটিকায় গোয়াইনঘাট উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়ে এই সরজমিন তদন্ত অনুষ্ঠিত হয়।
তদন্তকালে অভিযুক্ত শিক্ষকের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ, চরিত্রহীনতা ও ধৃষ্টতার বিরুদ্ধে শিক্ষক সমাজ স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠেন। প্রায় ১৭০ জন শিক্ষক সশরীরে উপস্থিত হয়ে এই ন্যাক্কারজনক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করেন। এছাড়াও, ২৫০ জন শিক্ষকের পক্ষ হতে ইতিপূর্বে আনীত অভিযোগের ভিত্তিতে প্রশাসন এই তদন্তভার গ্রহণ করে। তদন্ত চলাকালে যৌন হয়রানির শিকার এক নিষ্পাপ শিশুর পিতাসহ অসংখ্য ভুক্তভোগী নারী শিক্ষিকা লিখিত অভিযোগপত্র তদন্ত কর্মকর্তার নিকট হস্তান্তর করেন। অভিযুক্তের দুর্ব্যবহার ও লালসার কারণে পুরো শিক্ষক সমাজে চরম অসন্তোষ ও ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দাখিলকৃত সম্মিলিত অভিযোগপত্রে সালিকুর রহমানের বিরুদ্ধে প্রভূত রোমহর্ষক ও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা শাহনাজ আক্তারকে তিনি দীর্ঘকাল যাবত মানসিক নিপীড়ন, যৌন হয়রানি এবং ধর্ষণের অপচেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন। ভুক্তভোগী শিক্ষিকা এর প্রতিবাদ জানালে তাকে দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে বদলি করার প্রচ্ছন্ন হুমকি প্রদান করা হয়। ইতঃপূর্বে উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক গঠিত তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উক্ত অভিযোগের অকাট্য সত্যতা প্রমাণিত হওয়ায় তাকে অন্যত্র বদলির সুপারিশ করা হয়েছিল। তদুপরি, জকিগঞ্জ উপজেলায় কর্মরত থাকাবস্থায় অপর এক নারী সহকর্মীর সহিতও তিনি সমরূপ অশোভন ও গর্হিত আচরণ করেছিলেন বলে জানা যায়।
শিক্ষার্থীদের প্রতি লোলুপ দৃষ্টি ও শ্লীলতাহানির অভিযোগটিও অত্যন্ত গুরুতর। বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাসমিয়াকে অফিস কক্ষে একা পেয়ে জোরপূর্বক আলিঙ্গন ও শ্লীলতাহানির অপচেষ্টা করেন তিনি, যার প্রেক্ষিতে ক্ষুব্ধ অভিভাবকমহল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সমীপে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। এর পূর্বে নিয়ামগুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত থাকাকালে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী খাদিমা বেগমের শ্লীলতাহানির অপচেষ্টায় তিনি লিপ্ত ছিলেন, যা তৎকালীন সময়ে সুকৌশলে ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল।
কেবল শিক্ষার্থী ও সহকর্মীই নয়, অভিভাবকদের সহিতও তিনি চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণ করে আসছিলেন। পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাদিয়া আক্তার ইতি’র অভিভাবক জন্মনিবন্ধন সংশোধনের নিমিত্তে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রার্থনা করতে গেলে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ এবং চরম দুর্ব্যবহার করেন।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে ঊর্ধ্বতন শিক্ষা কর্মকর্তা এবং ২৫টি বিদ্যালয়ের নির্দোষ শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বেনামি ও বানোয়াট অভিযোগপত্র প্রেরণ করে শিক্ষা বিভাগে পরিকল্পিতভাবে অস্থিতিশীলতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাঁয়তারা করার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে রয়েছে। এমনকি তদন্ত চলাকালেও তিনি ঔদ্ধত্য প্রদর্শনপূর্বক অভিযোগকারীদের পক্ষ নিয়ে বাগ্বিতণ্ডা ও চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপপ্রয়াস চালান। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো পবিত্র স্থানে এমন নীতিগর্হিত ও কলঙ্কজনক অধ্যায়ের উন্মোচনে স্থানীয় জনমনে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে এই দুর্নীতিবাজ ও চরিত্রহীন শিক্ষকের দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবার, অভিভাবকমহল এবং সর্বস্তরের শিক্ষক সমাজ।
Leave a Reply