বিশেষ প্রতিবেদক: সিলেট সিটি করপোরেশনে (সিসিক) বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শাখাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নজিরবিহীন দুর্নীতি, অনিয়ম এবং একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের হরিলুটের চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। এই দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ড হিসেবে আঙুল উঠেছে সিসিকের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ একলিম আবদীনের দিকে। মন্ত্রণালয়ের নিয়োগের কোনো বৈধ নথি না থাকা সত্ত্বেও সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করা এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে হামলার মামলার এজহারভুক্ত আসামি হওয়ার পরও বহাল তবিয়তে থাকায় সিসিক প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ৮ ডিসেম্বর থেকে মোহাম্মদ একলিম আবদীন সিসিকের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সিটি করপোরেশন শাখায় তাঁর নিয়োগ সংক্রান্ত কোনো তথ্য বা নথির অস্তিত্বই নেই। বৈধ কোনো তথ্য না থাকার পরও তিনি নিয়মিত সরকারি বেতন-ভাতা এবং গাড়ি চালকসহ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে আসছেন। ক্ষমতাচ্যুত মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর অত্যন্ত আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত এই কর্মকর্তা পট পরিবর্তনের পরও কীভাবে এবং কোন অদৃশ্য মন্ত্রীর ছায়াতলে এখনো বহাল তবিয়তে আছেন, তা নিয়ে নগরজুড়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
মোহাম্মদ একলিম আবদীন সিসিকের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শাখাকে দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাঁর নেতৃত্বে সিসিকে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের মূল অপকর্মগুলোর মধ্যে- বর্জ্যবাহী গাড়ির জন্য বরাদ্দকৃত জ্বালানি তেল হরহামেশা তেল চুরি করে বাজারে বিক্রি। সিসিকের সরকারি গাড়ি অবৈধভাবে ভাড়ায় খাটিয়ে বিভিন্ন আবাসন প্রকল্প ও এলাকায় মাটি ভরাটের কাজ গাড়ি বাণিজ্য। দৈনিক মজুরিভিত্তিক (ডে লেবার) শ্রমিকদের উপস্থিতির সংখ্যা কাগজে-কলমে বাড়িয়ে দেখিয়ে ভুয়া মাস্টাররোলে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকার অতিরিক্ত বিল উত্তোলন। এই সিন্ডিকেটের সক্রিয় সদস্য সিসিকের বর্জ্য সুপারভাইজার ফারুক এবং গাড়ি চালক পিচ্চি বাবুল। মাত্র কয়েক বছরেই তাঁরা নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের মালিক এবং কোটিপতি বনে গেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
গণমাধ্যমে সিসিকের বর্জ্য শাখার এই হরিলুটের খবর সাপ্তাহিক তদন্ত রিপোর্টে প্রকাশের পর অবশেষে টনক নড়েছে প্রশাসনের। স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব মো. সগীর হোসেন স্বাক্ষরিত এক পত্রে মোহাম্মদ একলিম আবদীনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোরকজ) দেওয়া হয়েছে। ওই পত্রে জানতে চাওয়া হয়েছে কোন ভিত্তিতে তিনি এই পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন এবং কীভাবে সরকারি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। পত্র জারির ৩ কর্মদিবসের মধ্যে তাঁকে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের নিকট সশরীরে উপস্থিত হয়ে এই বিষয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। অন্যথায় তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। তবে আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে সন্তোষজনক কোনো অগ্রগতি হয়নি।
দায় এড়ানোর চেষ্টা ও কর্মকর্তাদের নীরবতা তবুও এই বিশাল অনিয়ম ও মন্ত্রণালয়ের কারণ দর্শানোর নোটিশের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ একলিম আবদীন স্পষ্ট কোনো জবাব দেননি। তিনি বলেন, এ বিষয়ে সিইও মহোদয়ের কাছ থেকে তথ্য নিতে হবে। আমার দপ্তরে এখনো সংশ্লিষ্ট কোনো চিঠি পৌঁছেনি।
অন্যদিকে, সিসিকের প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড কতটা ভেঙে পড়েছে তা স্পষ্ট হয় প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার ভূমিকায়। সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য জানতে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রেজাই রাফিন সরকার-এর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে, তিনি কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন এবং লাইনটি কেটে দেন।
মন্ত্রণালয় একলিম আবদীনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিলেও, তাঁর সিন্ডিকেটের মূল সহযোগী ফারুক ও পিচ্চি বাবুলরা এখনো রহস্যজনক কারণে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় ক্ষোভ কমেনি সিসিকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নগরবাসীর মনে। নাগরিক সমাজের দাবি, অতি দ্রুত এই সিন্ডিকেটকে আইনের আওতায় এনে সিসিককে দুর্নীতিমুক্ত করা হোক।
Leave a Reply