তদন্ত প্রতিবেদক: সিলেটে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত কমিটির অধীনে বাণিজ্য মেলা আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছে সিলেট উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এসডব্লিউসিসিআই)। আর এই ইতিবাচক উদ্যোগই যেন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট লুবানা ইয়াসমিন শম্পার জন্য।
মেলার নিয়ন্ত্রণ ও কোটি টাকার ইভেন্ট বাণিজ্য বাগিয়ে নিতে মাঠে নেমেছে বিগত আওয়ামী স্বৈরাচারী আমলের চিহ্নিত ‘মেলা মাফিয়া’ চক্র। আর এই চক্রের সাথে হাত মিলিয়েছেন খোদ উইমেন চেম্বারের সহ-সভাপতি (ভিপি) আলেয়া ফেরদৌসী তুলি। নিজেদের হীন স্বার্থ হাসিল করতে তারা বর্তমান কমিটির বিরুদ্ধে ‘ফ্যাসিস্ট’ তকমা সেঁটে দেওয়া থেকে শুরু করে ভুঁইফোঁড় পেজ ও নামসর্বস্ব পত্রিকায় অর্থ আত্মসাতের বানোয়াট অপপ্রচারে মেতে উঠেছে।
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সিলেটে যেকোনো বাণিজ্য মেলা বা কোরবানির পশুর হাটের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক ছিলেন এম. এ. মঈন খান বাবলু (ওরফে মেলা বাবলু) এবং গফফার। ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর একাধিক মামলার আসামি হয়ে আত্মগোপনে যাওয়া এই বিতর্কিত ব্যক্তিরা ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছেন উইমেন চেম্বারের মেলাকে কেন্দ্র করে। বর্তমান সরকারের আমলেও নিজেদের পুনর্বাসিত করতে এবং মেলার কোটি টাকার ইভেন্ট বাগিয়ে নিয়ে আগের মতো একক আধিপত্য বিস্তার করতে তারা মরিয়া।
এজন্য তারা প্রথমেই প্রেসিডেন্ট লুবানা ইয়াসমিন শম্পাকে ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন। সেখানে ব্যর্থ হয়ে তারা বেছে নেন ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ বা ভাগ করো ও শাসন করো নীতি। বাবলু ও গফফারের এই ষড়যন্ত্রের প্রধান ঘুঁটি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন উইমেন চেম্বারের সিলেকশনে নিয়োগ পাওয়া ভাইস প্রেসিডেন্ট আলেয়া ফেরদৌসী তুলি (নির্বাচিত পর্ষদের ১০ জন ভোটে পাশ করলেও তিনি সিলেকশনে পদ পান)।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তুলির লক্ষ্য ‘সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না’। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে মেলার ইভেন্ট বাবলুদের হাতে তুলে দিয়ে বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট লুবানা ইয়াসমিনকে বিতর্কিত করে পদচ্যুত করাই তার মূল ছক। লুবানাকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ প্রমাণ করে সরাতে পারলেই চেম্বারের মসনদ তার দখলে আসবে। আর তা না পারলেও মেলা ভণ্ডুল করে দিয়ে বর্তমান কমিটির সাফল্য ম্লান করে দেওয়াই তার উদ্দেশ্য। নিজেকে আড়ালে রেখে তিনি এই নোংরা খেলায় মেতেছেন।
নিজেকে নারী উদ্যোক্তা দাবি করলেও আলেয়া ফেরদৌসী তুলির উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যবসায়িক উদ্যোগ নেই। তার অতীত ইতিহাসও চরম বিতর্কিত। ব্র্যাক ব্যাংক থেকে কর্মজীবন শুরু করা তুলি পরবর্তীতে এনআরবি ব্যাংক পিএলসি-তে যোগ দেন। সেখানে আওয়ামী ঘরানার ধনকুবের ও বিতর্কিত ব্যবসায়ী মোহাম্মদ মাহতাবুর রহমান নাসিরের আশীর্বাদপুষ্ট ছিলেন তিনি। কিন্তু শিষ্টাচার ও পেশাদারিত্ব বিরোধী বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের দায়ে এনআরবি ব্যাংক থেকে তিনি পদত্যাগে বাধ্য হন। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর রাতারাতি নিজের ভোল পাল্টে তিনি এখন নিজেকে বিএনপির নিবেদিতপ্রাণ হিসেবে প্রমাণের হাস্যকর চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছেন।
অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মেলার অনুমোদন পাওয়া কিংবা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব কোনো প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার আগেই প্রেসিডেন্ট লুবানা ইয়াসমিন শম্পার বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা রীতিমতো হাস্যকর বলে মনে করছেন সাধারণ সদস্যরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ৪২ বছর বয়সী এক নারী পরিচালক বলেন, “বিগত কমিটি উইমেন চেম্বারকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারেনি, ফাণ্ড প্রায় শূন্য ছিল। বর্তমান কমিটি মেলার মাধ্যমে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য কোটি টাকার ফাণ্ড তৈরির চেষ্টা করছে। ঠিক এই সময়ে এমন অপপ্রচার অত্যন্ত নিন্দনীয়।” অন্য এক পরিচালক চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “সভাপতি যদি সত্যিই মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে কারো কাছ থেকে টাকা নিয়ে থাকেন, তবে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা পরিচালনা পর্ষদের কাছে লিখিত অভিযোগ দিচ্ছে না কেন?
সংগঠন প্রতিষ্ঠার প্রায় এক দশক পর সদস্যদের ভোটে একটি নির্বাচিত কমিটি (৫ আগস্টের পর গঠিত) যখন সিলেটের নারী উদ্যোক্তাদের জন্য কাজ করতে চাইছে, তখন এই সিন্ডিকেটের অপতৎপরতা পুরো আয়োজনকেই প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
এসব অভিযোগ ও ষড়যন্ত্রের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সিলেট উইমেন চেম্বারের প্রেসিডেন্ট লুবানা ইয়াসমিন শম্পা এবং অভিযুক্ত ভাইস প্রেসিডেন্ট আলেয়া ফেরদৌসী তুলির মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কেউই সাড়া দেননি।