মোঃ রায়হান হোসেন: সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) মোগলাবাজার থানার তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতি, আলামত আত্মসাতের চেষ্টা ও চোরাকারবারিদের মদদ দেওয়ার অকাট্য প্রমাণ পেয়ে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, সাবেক পুলিশ কমিশনার অজ্ঞাত কারণে সেই নির্দেশ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে গেছেন।
আর বর্তমানেও পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে আদালতের সেই আদেশ ফাইলবন্দি হয়ে ঝুলছে। রাষ্ট্রের একটি দায়িত্বশীল বাহিনী হয়েও পুলিশের এমন প্রকাশ্য আদালত অবমাননার ঘটনায় সিলেটজুড়ে বইছে নানা গুঞ্জন। জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, বর্তমান পুলিশ কমিশনারও কি তবে বিদায়ী কমিশনারের পদাঙ্ক অনুসরণ করে আদালতের নির্দেশনা অমান্য করছেন, নাকি এর নেপথ্যে রয়েছে অন্য কোনো অদৃশ্য কারণ?
আদালতের নথিপত্র এবং প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, মোগলাবাজার থানার জিআর ০৫/২৬ নং মামলায় জব্দকৃত ভারতীয় কম্বল আত্মসাতের এক ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রে মেতেছিলেন খোদ পুলিশেরই তিন কর্মকর্তা। তারা হলেন, মামলার এজাহারকারী কর্মকর্তা জিতেন চন্দ্র দাশ, দ্বিতীয় তদন্তকারী কর্মকর্তা কাজী তোবারক হোসেন এবং মোগলাবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনির হোসেন।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, গত ১২ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে মোগলাবাজার থানায় দায়েরকৃত স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্টের ওই মামলায় একটি কাভার্ডভ্যান থেকে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় কম্বল জব্দ করা হয়। কিন্তু এজাহারকারী কর্মকর্তা জিতেন চন্দ্র দাশ কোনো গণনা ছাড়াই মনগড়াভাবে এজাহারে ৪৩০ পিস কম্বল জব্দ দেখান। পরবর্তীতে জব্দকৃত আলামত জিম্মায় নেওয়ার জন্য জনৈক সেলিম আহমেদ আদালতে আবেদন করলে, ২য় তদন্ত কর্মকর্তা কাজী তোবারক হোসেন কোনো ধরনের সরেজমিন যাচাই-বাছাই না করেই আদালতে একটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট প্রতিবেদন দাখিল করেন। তিনি দাবি করেন, এই কম্বলগুলো শাহপরাণ থানার অপর একটি মামলায় নিলামে বিক্রি হওয়া মাল, যা সেলিম আহমেদ কিনেছিলেন। এই ভুয়া প্রতিবেদনে ইন্ধন জোগান এবং স্বাক্ষর করেন ওসি মনির হোসেন।
কিন্তু আদালতের কাছে তাদের এই প্রতিবেদন সন্দেহজনক ও সাংঘর্ষিক মনে হয়। সিলেটের অতিরিক্ত চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ফারহানা সুলতানা সত্য উদঘাটনের জন্য উভয় মামলার নমুনা আলামত তলব করেন এবং নিজে যাচাই করেন। যাচাইয়ে দেখা যায়, শাহপরাণ থানার নিলামকৃত কম্বলগুলো পাতলা এবং সিঙ্গেল লেয়ারের (Made in India), অথচ মোগলাবাজার থানায় জব্দকৃত কম্বলগুলো অত্যন্ত উন্নতমানের, ভারী এবং ডাবল লেয়ারের (BSSB Jannat Premium Mink Collection)।
এরপর আদালত গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে আদালতের নাজির ও বেঞ্চ সহকারীর নেতৃত্বে মোগলাবাজার থানা কম্পাউন্ডে রাখা কাভার্ডভ্যানটি খুলে পুনরায় কম্বল গণনার নির্দেশ দেন। ওই গণনায় কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসে। দেখা যায়, গাড়িতে প্রকৃতপক্ষে ৪৩০ পিস নয়, বরং ৫৬০ পিস উন্নতমানের কম্বল রয়েছে। অর্থাৎ, ১৩০ পিস কম্বল (যাঁর আনুমানিক মূল্য প্রায় ৪ লাখ টাকা) গায়েব করার পাঁয়তারা করেছিল পুলিশ।
এই জালিয়াতি ধরা পড়ার পর গত ৯ মার্চ ২০২৬ তারিখে এজাহারকারী, তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং ওসিকে সশরীরে আদালতে তলব করা হয়। আদালতে হাজির হয়ে তারা নিজেদের স্বপক্ষে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি এবং নীরব থেকে আদালতের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন। সার্বিক পর্যালোচনায় আদালত সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, থানার ওসির মদদপুষ্ট হয়ে এজাহারকারী এবং তদন্তকারী কর্মকর্তা দূরভিসন্ধিমূলকভাবে জব্দকৃত আলামত ১৩০ পিস কম্বল কম দেখিয়ে কিছু নিজেরা আত্মসাৎ করতে চেয়েছিলেন এবং বাকিটা চোরাকারবারিদের সাথে যোগসাজশে তাদের পকেট ভারী করতে চেয়েছিলেন।
আদালতের মতে, এর মাধ্যমে তারা শুধু রাষ্ট্রীয় স্বার্থই ক্ষুণ্ণ করেননি, বরং নিজেদের পেশা ও পোশাকের প্রতি চূড়ান্ত রকমের অমর্যাদা করেছেন। এই চরম অসদাচরণ ও দুর্নীতির দায়ে অতিরিক্ত চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ফারহানা সুলতানা গত ১৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে এক স্মারকের নং- ৫৭ এর মাধ্যমে ওই তিন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের কাছে নির্দেশ পাঠান। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আদালতের সুস্পষ্ট ও কঠোর নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও সাবেক পুলিশ কমিশনার অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই গ্রহণ করেননি। বর্তমান পুলিশ প্রশাসনও এই বিষয়ে রহস্যজনকভাবে নিশ্চুপ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি নিজেই আদালতের নির্দেশকে এভাবে প্রকাশ্যে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়, তবে সাধারণ মানুষের কাছে বিচার ব্যবস্থার প্রতি সম্মান ও আস্থার জায়গাটি যে চিরতরে বিনষ্ট হবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সচেতন মহলের দাবি, পুলিশের ভাবমূর্তি রক্ষার্থে অবিলম্বে আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন করে ওই তিন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।