বিশেষ প্রতিবেদক: আইনের শাসন ও সুবিচারের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ পুলিশ প্রশাসন, যার ওপর বর্তায় প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়। কিন্তু রক্ষক যখন নিজেই ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন সাধারণ মানুষের যাওয়ার জায়গা থাকে কোথায়? আজ এক ভয়াবহ ও চরম বাস্তবতার মুখোমুখি সিলেট তথা সারাদেশের মানুষ। সিলেটের গোলাপগঞ্জ থানা বর্তমানে নানা অব্যবস্থাপনা, অবহেলা, দুর্নীতি ও চরম হয়রানির এক ভয়ংকর আখড়ায় পরিণত হয়েছে, যা স্পষ্টতই মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে এসব অনিয়মের মুখোশ উন্মোচন করা এখন সময়ের দাবি।
অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়ার মানেই একজন মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ নয়। পুলিশ হেফাজতে থাকাকালীন আসামীর নিরাপত্তা ও মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের আইনি বাধ্যবাধকতা। কিন্তু গোলাপগঞ্জ থানায় এই নিয়মের চরম ব্যত্যয় ঘটছে। কাউকে আটকের পর তার পরিবার বা স্বজনদের তথ্য দিতে চরম অনীহা প্রকাশ করে পুলিশ। আসামী কোথায়, কী অবস্থায় আছে, তা সময়মতো না জানানোর ফলে পরিবারগুলোকে চরম উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে হয়। স্বজনদের খোঁজ পাওয়ার অধিকার প্রতিটি নাগরিকের থাকলেও গোলাপগঞ্জ থানায় তা প্রতিনিয়ত ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র এখানেই শেষ নয়। থানা হাজতে থাকা বন্দীদের খাবারের জন্য সরকারি অর্থ বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে ওই থানার আসামীরা এই ন্যূনতম সুযোগ থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। বাধ্য হয়ে পরিবারকে বাইরে থেকে খাবার সরবরাহ করতে হচ্ছে, নতুবা বন্দীদের কাটাতে হচ্ছে মানবেতর জীবন। হাজতিদের কল্যাণের জন্য বরাদ্দকৃত এই বিশাল সরকারি অর্থ আসলে কোথায় যাচ্ছে, সেই প্রশ্ন এখন জনমনে প্রবল। পাশাপাশি, হাজতখানার পরিবেশ ও টয়লেটের অবস্থা ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক। দীর্ঘদিন ধরে অপরিষ্কার ও অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় পড়ে থাকা এসব স্থানে অসহনীয় দুর্গন্ধের কারণে বন্দীরা সহজেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। প্রতি বছর থানার রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচ্ছন্নতার জন্য মোটা অঙ্কের সরকারি বরাদ্দ থাকলেও তার কোনো সুফল চোখে পড়ছে না।
থানার এসব কাঠামোগত অনিয়মের চেয়েও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ ছবেদ আলীর দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলা ও খামখেয়ালিপনা। অভিযোগ রয়েছে, ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ ছবেদ আলী সারারাত ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সাথে আড্ডা, খোশগল্প, দাওয়াত ও মোজমস্তিতে মত্ত থাকেন। ভোররাতে ঘুমানোর পর তার দিন শুরু হয় দুপুরে বা বিকেলে। শীর্ষ কর্মকর্তার এমন নজিরবিহীন রুটিনের কারণে থানার স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আসামীদের আদালতে চালান দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ আইনি কাজগুলো সম্পন্ন করা হয় বিকেল ৫টার পর। এই অযৌক্তিক ও চরম গাফিলতিপূর্ণ বিলম্বের কারণে অধিকাংশ আসামী সময়মতো আদালতের কার্যক্রমে অংশ নিতে পারেন না, ফলে জামিনসহ অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘসূত্রিতা। দায়িত্বশীল কর্মকর্তার এমন উদাসীনতায় একজন অভিযুক্তের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত হতে পারে না।
থানা হাজতে শোয়ার জায়গার চরম সংকট, পুলিশ সদস্যদের অহেতুক খারাপ আচরণ, রুটিন কাজে ফাঁকি দিয়ে খোশগল্পে মেতে ওঠা এবং ক্ষমতাসীনদের অপ্রয়োজনীয় তৈলমর্দন গোলাপগঞ্জ থানা যেন আজ সারাদেশের পুলিশ প্রশাসনের জাতগত সমস্যার এক ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি। রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি রক্ষায় এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গোলাপগঞ্জ থানাসহ দেশজুড়ে পুলিশের এই বেপরোয়া আচরণ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলো এখনই খতিয়ে দেখা অপরিহার্য। অনতিবিলম্বে গোলাপগঞ্জ থানার এই অমানবিক পরিস্থিতি পরিবর্তন এবং ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ ছবেদ আলীর স্বেচ্ছাচারী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের দ্রুত ও কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় সচেতন মহল।