বর-কনে আলাদা চিরনিদ্রায়, কাঁদছে এলাকাবাসীও | তদন্ত রিপোর্ট

শনিবার, ১৮ Jul ২০২৬, ১০:১৮ পূর্বাহ্ন

বর-কনে আলাদা চিরনিদ্রায়, কাঁদছে এলাকাবাসীও

বর-কনে আলাদা চিরনিদ্রায়, কাঁদছে এলাকাবাসীও

Oplus_16908288

Manual8 Ad Code

তদন্ত রিপোর্ট ডেস্ক: বাগেরহাটের রামপালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত বর-কনেসহ ১৪ জনের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। তবে বিয়েতে এক হওয়া বর-কনে আলাদা হলেন চিরনিদ্রায়। গতকাল শুক্রবার জুমার পর মোংলা উপজেলা পরিষদ মাঠে বর আহাদুর রহমান ছাব্বিরসহ তাঁর পরিবারের ৯ সদস্যের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর মোংলা কবরস্থানে পাশাপাশি ৯ জনকে দাফন করা হয়।

অন্যদিকে নিহত কনে মার্জিয়া আক্তার মিতুর পরিবারের চার সদস্যের জানাজা হয় খুলনার কয়রা উপজেলার নাকসা গ্রামের বাড়ির পাশের মাঠে। পরে কয়রায় পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় মিতু, তাঁর ছোট বোন লামিয়া আক্তার ও দাদি রাশিদা বেগমকে। আর দাকোপে আরেকটি জানাজা শেষে নানি আনোয়ারা বেগমের দাফন সম্পন্ন হয়েছে।

Manual6 Ad Code

নিহত মাইক্রোবাসচালক নাঈমের বাড়ি বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার পেড়িখালি ইউনিয়নের সিংগেরবুনিয়া গ্রামে। জুমার আগে গ্রামের বাড়িতে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

এক দুর্ঘটনায় দুই পরিবারের ১৩ জন এবং মাইক্রোবাসচালক নিহত হওয়ার ঘটনায় স্বজনহারাদের পাশাপাশি এলাকাবাসীও শোকাহত। কমলা বেগম নামে স্থানীয় এক নারী বলেন, ‘৩৫-৩৬ বছরের বেশি সময় আব্দুর রাজ্জাক (বরের বাবা) ভাই ও তাঁর পরিবারকে চিনি। ভালো মানুষ ছিলেন। এমন দুর্ঘটনায় আমরা পুরো এলাকাবাসী বাকরুদ্ধ হয়ে গেছি।’

নিহত আব্দুর রাজ্জাকের বড় ছেলে আশরাফুল আলম জনি পুরো সময়ই অস্বাভাবিক ছিলেন। কখনো ছেলেমেয়ের জন্য, কখনো বাবা-ভাইয়ের জন্য, আবার কখনো বোন ও স্ত্রীর জন্য স্বজনদের জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন। জনি বলেন, ‘এই দুর্ঘটনায় আমি বাবা, ভাই, স্ত্রী, তিন সন্তান, বোন, ভাগনে সবই হারিয়েছি। আমি খুব একা হয়ে গেলাম। তারপরও সবাইকে বলব, আল্লাহ যা করেছেন আমাদের কোনো অভিযোগ নেই। আমার বাবা রাজনীতি করতেন, ভাইয়েরা ব্যবসা করতেন, কারও যদি কোনো দেনাপাওনা থাকে জানাবেন, আমরা পরিশোধ করব।’ আর সবাইকে ক্ষমা করে দেওয়ার অনুরোধ করে জনি বলেন, ‘সকলে আমাদের জন্য দোয়া করবেন।’

গত বুধবার রাতে খুলনার কয়রা উপজেলার আমাদী ইউনিয়নের নাকসা গ্রামের বাসিন্দা আবদুস সালাম মোড়লের মেয়ে মার্জিয়া আক্তার মিতুর সঙ্গে বিয়ে হয় মোংলা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকের ছোট ছেলে আহাদুর রহমান ছাব্বিরের। কনের বাড়িতে বিয়ের পর বৃহস্পতিবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে বরপক্ষ মোংলার উদ্দেশে রওনা হয়। বর-কনেসহ দুই পরিবারের ১৫ জন ছিলেন মাইক্রোবাসে। তাঁদের বহনকারী মাইক্রোবাসটির সঙ্গে মোংলার কাছাকাছি রামপাল উপজেলার বেলাই ব্রিজ এলাকায় নৌবাহিনীর একটি স্টাফবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এ ঘটনায় মাইক্রোবাসের চালকসহ ১৪ জন নিহত হন। আহত একজনকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে মরদেহগুলো হস্তান্তর করা হয়।

Manual3 Ad Code

নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন বর আহাদুর রহমান ছাব্বির, তাঁর বাবা আব্দুর রাজ্জাক, বরের ভাই আব্দুল্লাহ সানি, বোন উম্মে সুমাইয়া ঐশী, তাঁর ছেলে সামিউল ইসলাম ফাহিম, বড় ভাই আশরাফুল আলম জনির স্ত্রী ফারহানা সিদ্দিকা পুতুল, তাঁদের ছেলে আলিফ, আরফা, ইরাম। অন্যরা হলেন কনে মার্জিয়া আক্তার মিতু, তাঁর ছোট বোন লামিয়া আক্তার, দাদি রাশিদা বেগম ও নানি আনোয়ারা বেগম মাইক্রোবাসচালক নাঈম। এবং বর ছাব্বিরের মোংলা শহরে মোবাইল ফোনের দোকান ছিল। আর কনে মিতু কয়রার নাকসা আলিম মাদ্রাসার আলিম প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।

Manual7 Ad Code

দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। গতকাল বিকেলে বাগেরহাটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মেজবাহ উদ্দিনকে প্রধান করে এই কমিটি করা হয়। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন বিআরটিএর বাগেরহাটের সহকারী পরিচালক লায়লাতুল মাওয়া এবং জেলা পুলিশের নবম গ্রেডের সমমর্যাদার একজন কর্মকর্তা। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান ও দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে দুর্ঘটনা রোধে করণীয় বিষয়ে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করবে কমিটি। কমিটিকে যথাসম্ভব দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে বলে জানান বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন।

Manual2 Ad Code

দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে এখন পর্যন্ত নৌবাহিনী, ট্রাফিক পুলিশ, বিআরটিএ বা সরকারি কোনো দপ্তরের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বা বিবৃতি পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুর্ঘটনার সময় বৃষ্টি হচ্ছিল এবং দুটি গাড়ির গতি স্বাভাবিকের থেকে অনেক বেশি ছিল।

প্রত্যক্ষদর্শী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমার বাড়ি এই পাশে। জীবনে এত বড় দুর্ঘটনা দেখি নাই। রফিক আরও বলেন, মাঝে মাঝেই এই জায়গায় এবং ব্রিজের দুই পাশে ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। কিন্তু ব্রিজের দুই পাশে কোনো সতর্কতামূলক চিহ্ন নেই।

২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর বেলাই ব্রিজ এলাকায় ট্রাকের ধাক্কায় একসঙ্গে মোটরসাইকেলের তিন আরোহী নিহত হন। কাটাখালি হাইওয়ে থানার ওসি মো. জাফর আহমেদ বলেন, নৌবাহিনীর দুর্ঘটনাকবলিত স্টাফবাস ও বর-কনে বহনকারী মাইক্রোবাসটি কাটাখালি হাইওয়ে থানায় রয়েছে। তবে এই দুর্ঘটনায় গতকাল পর্যন্ত নিহতদের পরিবার বা স্বজনদের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ করা হয়নি।

নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতার ঘোষণা দিয়েছে জেলা প্রশাসন। বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন জানান, নিহতদের প্রতি পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে ৫০ হাজার টাকা সহযোগিতা করা হবে। বর ও কনের দাফনের জন্য ২০ হাজার করে মোট ৪০ হাজার টাকা দেওয়া হবে। এ ছাড়া বিআরটিএ দুর্ঘটনা ক্ষতিপূরণ-সংক্রান্ত আর্থিক সহায়তা তহবিলসহ অন্যান্য সহযোগিতা নিয়ম অনুযায়ী পাবে হতাহতের পরিবার।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Add



© All rights reserved © tadantareport.com
Design BY Web WORK BD
ThemesBazar-Jowfhowo
Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code
error: Content is protected !!