বিশেষ প্রতিবেদক: সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) শাহপরান ও মোগলাবাজার থানাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক বিশাল অপরাধ সিন্ডিকেটের চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। মোগলাবাজার থানার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান (মনির হোসেন), তাঁর সহযোগী এসআই দয়াময় ও এএসআই জহিরুলের বিরুদ্ধে ক্ষমতার চরম অপব্যবহার, ঘুষ-বাণিজ্য, চোরাচালানের মালামাল আত্মসাৎ, নারী পুলিশ সদস্যদের ওপর অনৈতিক নিপীড়ন এবং জিম্মি বাণিজ্যের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। এসব অপকর্মের মাধ্যমে অর্জিত বিপুল পরিমাণ কালো টাকা পাচার করে ময়মনসিংহে গড়ে তোলা হয়েছে বিলাসবহুল প্রাসাদ।
শাহপরান থানায় কর্মরত থাকাকালীন ওসি মনিরের ‘মাফিয়া স্টাইলে’ শাসন চালানোর বিশদ বিবরণ দিয়েছেন তাঁর সাবেক এক বডিগার্ড। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বর্তমানে চট্টগ্রাম রেঞ্জে কর্মরত এই সদস্য জানান, ওসি মনির নিজে সরাসরি লাখ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণ করতেন এবং অপরাধ ঢাকতে অধীনস্থদের ওপর দায় চাপাতেন। শাহপরান থানা এলাকায় ৫-৬টি মাটি কাটার বেকু (এস্কাভেটর) থেকে সাপ্তাহিক ১০ হাজার টাকা, স্থানীয় ‘মৌলা’ নামক ব্যক্তির মাটি কাটার স্থান থেকে সাপ্তাহিক ১০ হাজার টাকা এবং ভারতীয় কমলা চোরাচালানের গাড়ি থেকে নিয়মিত মাসোহারা তোলা হতো। সরকারি বেতনের ৭০ শতাংশ ঋণের কিস্তিতে চলে গেলেও তাঁর চালচলন ও অবৈধ লেনদেনের পরিমাণ ছিল আকাশচুম্বী। অভিযোগের সবচেয়ে নজিরবিহীন অংশ হলো বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও নৈতিক স্খলন। সাবেক বডিগার্ডের ভাষ্যমতে, অনৈতিক প্রস্তাবে সায় দেওয়া নারী পুলিশ সদস্যদের ডিউটি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হতো। এছাড়া, নিজস্ব অপকর্ম ঢাকতে খোদ এসএমপি কমিশনারের সামনেও ভুল তথ্য পরিবেশন করে অধীনস্থ ড্রাইভার ও বডিগার্ডদের ফাঁসান তিনি।
মোগলাবাজার থানায় স্থানান্তরের পরও বন্ধ হয়নি ওসি মনিরের অপরাধযজ্ঞ। ভারতীয় ৫৬০ পিস ডাবল-পার্ট কম্বল জব্দ মামলায় (জিআর-০৫/২৬) ওসির নির্দেশে প্রকৃত সংখ্যা ও মান গোপন করে এজাহারে মাত্র ৪৩০ পিস দেখানো হয়। মূলত ১৩০ পিস দামি কম্বল আত্মসাৎ এবং আসামি-চোরাকারবারিদের সুবিধা পাইয়ে দিতে শাহপরান থানার অপর একটি মামলার নিলামকৃত কম্বলের সাথে জিম্মানামার জালিয়াতি সাজানো হয়। পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে গঠিত বিশেষ তদন্ত কমিটি থানা কম্পাউন্ডে তল্লাশি চালিয়ে সম্পূর্ণ ৫৬০টি কম্বল উদ্ধার করে। জালিয়াতির দায়ে পরিদর্শক (তদন্ত) কাজী তোবারক হোসেন আদালতের সামনে অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা চাইলেও, মূল পরিকল্পনাকারী ওসি মনির হোসেন বহাল তবিয়তে রয়ে গেছেন।
ওসি মনিরের প্রত্যক্ষ ছত্রছায়ায় মোগলাবাজার থানায় তান্ডব চালাচ্ছেন বিতর্কিত এসআই দয়াময়। সুপ্রিম কোর্টের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা লঙ্ঘন করে গত আড়াই মাস আগে সিলেট জেলা ছাত্রদলের সাবেক নেতা রেজওয়ান হোসেন রিমুকে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাঁকে একটি অজ্ঞাত মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে রিমান্ডে নির্যাতন চালানো হয় এবং হোয়াটসঅ্যাপে পরিবারের সামনে কান্নাকাটি করিয়ে ১৫ হাজার টাকা ঘুষ আদায় করা হয়। এমনকি নিজ বাহিনীর এক সদস্যের বিরুদ্ধে সিআর মামলার তদন্তভার নিয়ে গত ১ জুন ২০২৬ তারিখে থানায় ডেকে এনে বাদীপক্ষের গুণ্ডাবাহিনী দিয়ে বেধড়ক মারধর করানোর অভিযোগ উঠেছে দয়াময়ের বিরুদ্ধে। দাউদপুর চৌধুরী বাজারের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সোর্স তোফায়েল হোসেন পাপ্পুর মাধ্যমে ওসির নামে নিয়মিত চাঁদাবাজির মূল কারিগরও এই কর্মকর্তা।
অন্যদিকে, আলমপুর বাজারের ক্ষুদ্র মাছ বিক্রেতাদের কাছ থেকে প্রতিদিন ওসির নাম ভাঙিয়ে ৩,০০০ টাকা চাঁদা আদায় এবং বিশেষ করে ডিউটির সময়ে নাম্বরবিহীন সিএনজি চালকদের জিম্মি করার অভিযোগ উঠেছে এএসআই জহিরুলের বিরুদ্ধে। স্থানীয় শিববাড়িতে স্থানীয় দিপু নামের এক যুবকের মারফতে টাকার বিনিময়ে নারী এনে রাতের আঁধারে অনৈতিক আসর বসানোর সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিলেছে। এই কর্মকর্তার লাগামহীন অপকর্মে থানা পুলিশেও চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ওসি মনিরের অবৈধ আয়ের টাকা ময়মনসিংহের কাশর এলাকায় ৩ তলা বিলাসবহুল ভবন নির্মাণে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ টাকা তাঁর মেজ ছেলে আকিব এবং কেয়ারটেকার মোস্তফার বিকাশ নম্বরে পাঠানো হতো। প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে এক শ্রেণির সংবাদকর্মীর সহায়তায় সত্যকে ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে বলে সচেতন মহল ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি রক্ষা, জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির লক্ষ্যে ওসি মনিরুজ্জামান ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে বিভাগীয় মামলা ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জোর দাবি উঠেছে।
Leave a Reply