বিশেষ প্রতিবেদক: সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার পূর্ব জাফলং ও প্রতাপপুর সীমান্তে চোরাচালান ও মাদক সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে উঠেছেন দুলাল আহমদ ওরফে ‘লাইনম্যান দুলাল’। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) নাম ভাঙিয়ে লাখ লাখ টাকা চাঁদাবাজি এবং প্রশাসনের নাকের ডগায় গড়ে তুলেছেন এক অপ্রতিরোধ্য সিন্ডিকেট। তার বেপরোয়া মাদক বাণিজ্যে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে স্থানীয় যুবসমাজ, অন্যদিকে সংবাদ সংগ্রহে গেলে সাংবাদিকদের ওপর নেমে আসছে সশস্ত্র হামলা ও প্রাণনাশের হুমকি।
হাজিপুর (ঢালার পার) এলাকার মৃত ইদ্রিস ওরফে মন্ত্রীর পুত্র দুলাল (৩২) বর্তমানে সীমান্ত এলাকার এক মূর্তিমান আতঙ্ক। ভারত-বাংলাদেশের অসাধু ব্যবসায়ীদের সাথে আঁতাত করে তিনি প্রতিদিন নিরাপদে দেশে ঢোকাচ্ছেন মরণনেশা ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজা, মদ, মোটরসাইকেলের টায়ার ও যন্ত্রাংশসহ নিষিদ্ধ সব ভারতীয় পণ্য। এছাড়া প্রতাপপুর ও নকশিয়া লামাপুঞ্জি সীমান্ত দিয়ে প্রতিনিয়ত দেশে প্রবেশ করছে চোরাই গরু-মহিষের চালান। শুধু আমদানিই নয়, তার ছত্রচ্ছায়ায় বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাচার হচ্ছে মহামূল্যবান স্বর্ণ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নিজেকে বিজিবির ‘লাইনম্যান’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে দুলাল সীমান্ত এলাকার ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে রেখেছেন। দাবি করা মোটা অঙ্কের চাঁদা দিতে সামান্য বিলম্ব বা অস্বীকৃতি জানালেই নেমে আসে নির্যাতনের খড়গ। ব্যবসায়ীদের মালামাল বিজিবিকে দিয়ে ধরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি করা হয় শারীরিক লাঞ্ছনা। অভিযোগ রয়েছে, এই চাঁদাবাজির বখরা পৌঁছায় কিছু অসাধু কর্মকর্তার পকেটেও, যার আশীর্বাদে দুলাল রাতারাতি বনে গেছেন চোরাচালান সাম্রাজ্যের মুকুটহীন সম্রাট।
অতীতেও সীমান্ত দিয়ে গরু-মহিষ চোরাচালান চক্র পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠলে বিষয়টি স্থানীয় সাংবাদিকদের নজরে আসলে পেশাগত দায়িত্ব পালনে সাংবাদিকরা সংবাদ সংগ্রহে গেলে লাইনম্যান দুলাল ও তার সন্ত্রাসী বাহিনী দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এতে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক আহত হন, এমন ঘটনায় তাৎক্ষণিক মামলাও দায়ের করেছিল সাংবাদিকরা। এখানেই শেষ নয়, বিভিন্ন অপরিচিত নম্বর থেকে সাংবাদিকদের প্রতিনিয়ত প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে দুলাল। এমনকি সীমান্তে গেলে নিষিদ্ধ মাদক দিয়ে ফাঁসিয়ে বিজিবির মাধ্যমে গ্রেপ্তারেরও ভয়ভীতি দেখাচ্ছে এই চিহ্নিত অপরাধী।
গোয়াইনঘাট থানা পুলিশ ও সিলেট জেলা প্রশাসনের কঠোর নজরদারি থাকার কথা থাকলেও, জাফলং সীমান্তে কীভাবে এমন রমরমা মাদক ও চোরাচালান ব্যবসা চলছে—তা নিয়ে জনমনে তীব্র প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। দুলালের অবাধ মাদক বাণিজ্যের কারণে চরম উৎকণ্ঠায় দিন পার করছেন সাধারণ অভিভাবকরা। সচেতন মহলের দাবি, যুবসমাজকে রক্ষায় অনতিবিলম্বে এই গডফাদার ও তার সিন্ডিকেটকে সমূলে উৎপাটন করতে হবে।
এ বিষয়ে সংগ্রাম বিজিবি ক্যাম্প কমান্ডারের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “কে এই দুলাল, তা আমার জানা নেই। তবে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে, সত্যতা প্রমাণিত হলে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
অন্যদিকে প্রতাপপুর বিজিবি ক্যাম্পের সুবেদার জানান, “দুলাল নামে বিজিবির কোনো লাইনম্যান নেই। তবে সে বিজিবির নাম ভাঙিয়ে টাকা তুলছে বলে শুনেছি। হাতেনাতে প্রমাণ পেলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” প্রশাসনের এমন দায়সারা বক্তব্যের মাঝেই নির্বিঘ্নে চলছে লাইনম্যান দুলালের চোরাচালান ও চাঁদাবাজি, যা দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সীমান্ত এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
Leave a Reply