বিশেষ প্রতিবেদক: ঘুষ, জিম্মি বাণিজ্য, আদালত প্রাঙ্গণ থেকে অবৈধ গ্রেপ্তার এবং ক্ষমতার চরম অপব্যবহার, সব মিলিয়ে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) মোগলাবাজার থানা যেন এসআই দয়াময় ও ওসি মনির হোসেনের রাজত্বে পরিণত হয়েছে। গত বছরের ৫ আগস্টের সরকার পরিবর্তনের আগে এই থানা থেকে ক্যাডার হিসেবে র্যাবে বদলি হলেও পরবর্তীতে ফের একই থানায় জেঁকে বসেন এসআই দয়াময়। অভিযোগ উঠেছে, মোগলাবাজার থানার ওসি মনিরের প্রত্যক্ষ ছত্রছায়ায় এলাকায় এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন এই বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তা।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, গত আড়াই মাস আগে সিলেট জেলা ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র সদস্য রেজওয়ান হোসেন রিমু একটি মামলায় হাজিরা দিতে আদালত প্রাঙ্গণে আসেন। আদালত প্রাঙ্গণ থেকে আসামি গ্রেপ্তারে সুস্পষ্ট আইনি নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তোয়াক্কা করেননি দয়াময়। ওসির নির্দেশে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা ধূলিসাৎ করে আদালত চত্বর থেকেই রিমুকে জোরপূর্বক তুলে নেওয়া হয় ডিবি কার্যালয়ে। পরবর্তীতে সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইনের গাড়িতে হামলা ও ৫০ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের একটি ‘অজ্ঞাত’ মামলায় সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
আদালত রিমুর ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করলে দয়াময়ের জিম্মি বাণিজ্য শুরু হয় চরম নির্মমতায়। রিমান্ড চলাকালীন স্বজনদের সাথে আসামির যোগাযোগের সুযোগ না থাকলেও দয়াময় তার ব্যক্তিগত নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে রিমুর স্বজনদের ভিডিও কল দেন। সেখানে নির্যাতন চালিয়ে রিমুকে পরিবারের সামনে কান্নাকাটি করতে বাধ্য করা হয়। স্বজনদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে ওসির নামে ১০ হাজার এবং নিজ পকেটের জন্য ১০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন তিনি। রিমুর ভাই বিকাশ মারফতে (প্রমাণাদি প্রতিবেদকের নিকট সংরক্ষিত) দুই দফায় ১৫ হাজার টাকা ঘুষ দিতে বাধ্য হলে রিমান্ডের কথিত শারীরিক নির্যাতন থামানো হয়।
এসআই দয়াময়ের হাত থেকে রেহাই পাননি নিজ বাহিনীর এক সদস্যও। জানা যায়, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে জমি-জমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে মোগলাবাজার থানায় একটি জিডি (সাধারণ ডায়েরি) করেন ওই পুলিশ সদস্য। তদন্তের দায়িত্ব পেয়েই এসআই দয়াময় তার কাছে মোটা অঙ্কের ঘুষ দাবি করেন। সহকর্মীর কাছে ঘুষ চেয়ে ব্যর্থ হয়ে গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে সেই জিডির তদন্ত আটকে রাখেন দয়াময়।
শুধু তাই নয়, পরবর্তীতে ওই পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া একটি সিআর নালিশি মামলার তদন্তভারও কৌশলে নিজের হাতে নেন দয়াময়। তদন্তের অজুহাতে গত ১ জুন ২০২৬ তারিখে ওই পুলিশ সদস্যকে থানায় ডেকে আনা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, বাদীপক্ষের সাথে দয়াময়ের পূর্ব চুক্তি অনুযায়ী ওই পুলিশ সদস্য থানার গেটে পৌঁছামাত্রই প্রতিপক্ষের সন্ত্রাসীরা দয়াময়ের চোখ ও উপস্থিতির সামনেই তাকে বেধড়ক মারধর করে। এই চরম অন্যায়ের প্রতিকার চেয়ে ভূক্তভোগী পুলিশ সদস্য সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করলেও কোনো সুফল মেলেনি। অভিযোগ রয়েছে, ওসি মনির হোসেনের সমস্ত অপকর্ম ও অবৈধ আয়ের মূল সহযোগী দয়াময় হওয়ায় প্রশাসনিকভাবে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এমনকি দাউদপুর চৌধুরী বাজারের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সোর্স তোফায়েল হোসেন পাপ্পুর মাধ্যমে ওসির নামে নিয়মিত মাসোহারা চাঁদা তোলার মূল কারিগরও এই দয়াময়।
আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি, ক্ষমতার বাহাদুরি এবং এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে এসআই দয়াময়ের সাথে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর না দিয়ে ধৃষ্টতার সাথে হুঙ্কার ছেড়ে বলেন, আমি এসব বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেবো না, যা বলার আমার সিনিয়র অফিসারদের বলুন। একজন সাধারণ সাব-ইনস্পেক্টরের এমন ঔদ্ধত্য এবং একের পর এক অপকর্মের ঘটনায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিরপেক্ষতা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা আজ চরম প্রশ্নের মুখে। ভূক্তভোগীদের দাবি, অনতিবিলম্বে এই দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হোক।
Leave a Reply