বিশেষ প্রতিবেদক: সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) কর শাখা এখন নগরবাসীর কাছে এক মুর্তিমান আতঙ্কের নাম। বাসা-বাড়ির হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণের নামে এই শাখায় চলছে রীতিমতো নৈরাজ্য। প্রথমে অস্বাভাবিক ও নজিরবিহীন করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয় গ্রাহকের ওপর, এরপর ঘুষের বিনিময়ে তা কমানোর অভিনব ফাঁদ পাতে একটি অসাধু চক্র। আর এই পুরো দুর্নীতি ও হরিলুটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সিসিকের প্রধান এসেসর মো. আবদুল বাছিত। সংশ্লিষ্ট সূত্র ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, শাখাটিতে গড়ে ওঠা শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন খোদ নগরবাসী। মাঠ পর্যায় থেকে শুরু করে অফিস, সবখানেই ঘুষ ছাড়া কোনো ফাইল নড়ে না।
সিসিকের কর শাখার চার কর্মকর্তার নেতৃত্বে একটি সুকৌশলী চক্র এই ঘুষ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রথমে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দিয়ে গ্রাহকদের কাছে অস্বাভাবিক হোল্ডিং করের চিঠি পাঠানো হয়। অতিরিক্ত করের অঙ্ক দেখে দিশেহারা গ্রাহকরা কর কমানোর আবেদন করলে, তাদের সরাসরি কর শাখার প্রধান কর্মকর্তার (এসেসর) সাথে যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়। গ্রাহকরা কর শাখায় গেলে শুরু হয় দরকষাকষি। মোটা অঙ্কের ঘুষ দিলে নানা অজুহাত দেখিয়ে কর কমিয়ে দেওয়া হয়। আর টাকা না দিলে ভোগান্তির কোনো অন্ত থাকে না, ফাইলে আটকে থাকে মাসের পর মাস। যেখানে নতুন ভবন নির্মাণ হচ্ছে বা নতুন সংযুক্ত ১৫টি ওয়ার্ডের বাসিন্দারা, সেখানেই এই চক্রটি বেশি নজরদারি ও হয়রানি করছে।
এই দুর্নীতির মূল হোতা মো. আবদুল বাছিত। জানা যায়, তিনি সিলেট পৌরসভায় শুরুতে একজন সাধারণ টাইপিস্ট হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। কিন্তু ২০০০ সালের দিকে প্রভাব খাটিয়ে সহকারী এসেসরের পদ বাগিয়ে নেন। সম্প্রতি চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে তাকে প্রধান এসেসরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন এই শাখায় রাজত্ব করে বাছিত সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। নগরীর ৫নং ওয়ার্ডের খাসদবির এলাকায় তার বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে। প্রয়াত মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান, সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী এবং সর্বশেষ পলাতক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর আমলেও তিনি সমানতালে দুর্নীতি চালিয়ে গেছেন। শুধু তাই নয়, এসেসমেন্ট শাখাকে তিনি যেন নিজের ‘পারিবারিক সম্পত্তিতে’ পরিণত করেছেন। বর্তমানে এই শাখায় তার শ্যালক, ভাতিজা ও ভাগনে কর্মরত রয়েছেন। আত্মীয়দের দাপটে অফিসের অন্য কেউ টুঁ শব্দ করারও সাহস পান না। আবদুল বাছিতের এই দুর্নীতি সাম্রাজ্যের অন্যতম সহযোগী হলেন এসেসর কবির উদ্দিন চৌধুরী। পানি শাখায় নিয়োগ পেলেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে এসেসমেন্ট শাখায় কাজ করছেন। এছাড়া কামরানের আমলে মাস্টাররোলে নিয়োগ পাওয়া বাবলু ও মাহবুব ২০১২ সালে হাইকোর্টের নির্দেশে চাকরি স্থায়ী হওয়ার পর থেকে এই সিন্ডিকেটের বেপরোয়া সদস্য হিসেবে কাজ করছেন। কর্মচারী সংসদের নেতা হওয়ায় এদের হাত অনেক লম্বা, যে কারণে কেউ এদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার সাহস পায় না।
২০২৩ সালে সিসিকের নজিরবিহীন কর ধার্যের সময় এই দুর্নীতির টিমওয়ার্ক চরম আকার ধারণ করে। তৎকালীন পলাতক মেয়র আনোয়ারুজ্জামানের পিএস শহীদ চৌধুরী ও আবদুল বাছিত মিলে কয়েক কোটি টাকার দুর্নীতি করেন। হোল্ডিং মালিকদের কর কমানোর আবেদন শহীদ চৌধুরীর কাছে যেত খামভর্তি টাকাসহ। শহীদ নিজে ফাইলে কর কমিয়ে টাকার পরিমাণ লিখে দিতেন, আর সেই টাকা পকেটে ভরতেন বাছিত। এই লিয়াজোঁর মূল মাধ্যম হিসেবে কাজ করতো সুজন নামের এক মাস্টাররোল কর্মচারী। ছাত্রলীগ নেতা সুজনকে সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান সহকারী কর কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। গণ-অভ্যুত্থানের পর শহীদ চৌধুরীসহ অনেকেই পালিয়ে গেলেও সুজন এখনো বহাল তবিয়তে কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে সিলেট সিটি করপোরেশনের এসেসমেন্ট শাখার দুর্নীতিবাজরা বসে নেই, পুরাতন ২৭টি ও নতুন ১৫টি ওয়ার্ড মিলিয়ে তাদের দৌরাত্ম্য আগের মতোই চলছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মেয়রের দপ্তরের এক কর্মকর্তা আক্ষেপ করে জানান, “বাছিত-কবিররা একসময় আওয়ামী লীগের অলিখিত কর্মী সেজে পিএস শহীদের রুমে বসে থাকতো। আমরা নিয়মিত স্টাফ হয়েও কাজ করার সুযোগ পাইনি। এখন সরকার বদলালেও তাদের দুর্নীতির নেটওয়ার্ক আগের মতোই রয়ে গেছে।” দুর্নীতিবাজ এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে নগরবাসীর ভোগান্তি ও ক্ষোভ আরও চরমে পৌঁছাবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
এসব বিষয়ে জানতে সিসিকের প্রধান এসেসর মো. আবদুল বাছিতের ব্যবহৃত সেলফোনে যোগাযোগ করলে তিনি ফোনকল রিসিভ না করায় বক্তব্য সংগ্রহ করা যায় নি।
Leave a Reply