নিজস্ব প্রতিবেদক:;সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) কর শাখা যেন এখন রীতিমতো একটি ‘দুর্নীতির কারখানায়’ পরিণত হয়েছে। বিজ্ঞাপন কর ফাঁকি থেকে শুরু করে হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণ—প্রতিটি ক্ষেত্রে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এই চক্রের দৌরাত্ম্যে সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব, আর জিম্মি হয়ে পড়েছেন নগরবাসী।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড ও এলইডি সাইনবোর্ড থেকে সরকারি কোষাগারে বিপুল রাজস্ব আসার কথা থাকলেও তা লুট করছে ‘জামিল-রাশেদ-গৌতম’ নামে পরিচিত একটি সিন্ডিকেট। সিটি কর্পোরেশনের আদর্শ কর তফসিল অনুযায়ী, এলইডি টিভি সাইনবোর্ডের জন্য প্রতি বর্গফুটে বার্ষিক ২০ হাজার টাকা কর নির্ধারিত। কিন্তু এই চক্রটি নামমাত্র কর আদায় করে বাকি টাকা নিজেদের পকেটে ভরছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এই সিন্ডিকেটকে ‘অতিরিক্ত অনানুষ্ঠানিক অর্থ’ না দিলে হয়রানি করা হয়। বিনা নোটিশে মামলা দায়ের বা অনুমোদন প্রক্রিয়ায় জটিলতা সৃষ্টি করে ব্যবসায়ীদের জিম্মি করাই তাদের প্রধান কৌশল।
বাসা-বাড়ির হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণেও চলছে ভয়াবহ নৈরাজ্য। সিসিকের প্রধান এসেসর মো. আবদুল বাছিতের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেট আগে গ্রাহকদের ওপর অস্বাভাবিক করের বোঝা চাপিয়ে দেয়। এরপর কর কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঘুষ বাণিজ্য চালায়।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্যমতে, মাঠ পর্যায় থেকে অফিস—ঘুষ ছাড়া কোনো ফাইলই নড়ে না। বিশেষ করে নতুন সংযুক্ত ১৫টি ওয়ার্ডের বাসিন্দারা এই চক্রের প্রধান লক্ষ্যবস্তু।
অভিযোগ রয়েছে, প্রধান এসেসর মো. আবদুল বাছিত এই পুরো বিভাগকে নিজের ‘পারিবারিক সম্পত্তিতে’ পরিণত করেছেন। টাইপিস্ট থেকে সহকারী এসেসর এবং পরবর্তীতে প্রভাব খাটিয়ে প্রধান এসেসরের দায়িত্ব পাওয়া বাছিত গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। নগরীর খাসদবির এলাকায় রয়েছে তার বিলাসবহুল বাড়ি। ক্ষমতার পালাবদলে বারবার সরকার পরিবর্তন হলেও বাছিতের দাপট কমেনি। নিজের শ্যালক, ভাতিজা ও ভাগ্নেকে শাখায় চাকরি দিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন দুর্ভেদ্য দুর্গ।
তার অন্যতম সহযোগী এসেসর কবির উদ্দিন চৌধুরী, বাবলু ও মাহবুব দীর্ঘ দিন ধরে এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় থাকলেও কর্মচারী সংসদের দাপটে কেউ মুখ খোলার সাহস পায় না।
২০২৩ সালে পলাতক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর সময় তার পিএস শহীদ চৌধুরী ও আবদুল বাছিত মিলে কয়েক কোটি টাকার দুর্নীতি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। লিয়াজোঁ হিসেবে কাজ করতেন মাস্টাররোল কর্মচারী সুজন। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর পিএস শহীদ চৌধুরী পালিয়ে গেলেও, রহস্যজনক কারণে বহাল তবিয়তে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন সুজনসহ সিন্ডিকেটের মূল হোতারা। সিসিকের এক কর্মকর্তা আক্ষেপ করে বলেন, “সরকার বদলালেও এদের দুর্নীতির নেটওয়ার্ক আগের মতোই রয়ে গেছে। আমরা নিয়মিত কর্মী হয়েও এদের দৌরাত্ম্যে কোণঠাসা।”
সিসিক কর শাখার এই দুর্নীতি নিয়ে নগরজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। সচেতন মহলের মতে, এই সিন্ডিকেট নগরবাসীর জন্য মূর্তমান আতঙ্ক। অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে অডিট কার্যক্রম পরিচালনা এবং দুর্নীতির সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এসব বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য প্রধান এসেসর মো. আবদুল বাছিতের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
নগরবাসী এখন তাকিয়ে আছেন প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপের দিকে, যা এই ‘সিন্ডিকেট রাজত্বের’ অবসান ঘটিয়ে সিসিকের স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনবে।
Leave a Reply