নিজস্ব প্রতিবেদক, সিলেট: সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) কর শাখা এখন নগরবাসীর কাছে এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম। হোল্ডিং ট্যাক্স নির্ধারণ থেকে শুরু করে বিজ্ঞাপনের কর আদায়—প্রতিটি ক্ষেত্রেই গড়ে উঠেছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এই চক্রের দৌরাত্ম্যে সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব, আর জিম্মি হয়ে পড়েছেন সাধারণ নগরবাসী। এই পুরো দুর্নীতি ও হরিলুটের মূল হোতা হিসেবে অভিযোগের আঙুল উঠেছে সিসিকের প্রধান এসেসর মো. আবদুল বাছিতের দিকে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সিসিকের কর শাখায় নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করা হয় না। প্রথমে মাঠ পর্যায়ের কর্মী দিয়ে গ্রাহকদের ওপর অস্বাভাবিক ও নজিরবিহীন করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়। অতিরিক্ত কর দেখে দিশেহারা গ্রাহকরা যখনই কর কমানোর আবেদন করেন, তখনই তাদের প্রধান এসেসরের দপ্তরে যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়। সেখানে শুরু হয় গোপনমদরকষাকষি। মোটা অঙ্কের ঘুষ দিলে ফাইল নড়ে, অন্যথায় মাসের পর মাস ফাইল আটকে রেখে চলে চরম ভোগান্তি। বিশেষ করে নতুন সংযুক্ত ১৫টি ওয়ার্ডের বাসিন্দারা এই চক্রের প্রধান লক্ষ্যবস্তু।
অভিযোগ রয়েছে, প্রধান এসেসর মো. আবদুল বাছিত এই বিভাগকে নিজের ‘পারিবারিক সম্পত্তিতে’ পরিণত করেছেন। টাইপিস্ট হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করা বাছিত প্রভাব খাটিয়ে সহকারী এসেসর এবং পরবর্তীতে প্রধান এসেসরের দায়িত্ব বাগিয়ে নেন। দীর্ঘদিনের দুর্নীতিতে তিনি নগরীর খাসদবির এলাকায় গড়ে তুলেছেন বিলাসবহুল বাড়ি। সিসিকের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে তিনি নিজের শ্যালক, ভাতিজা ও ভাগ্নেকে নিয়োগ দিয়ে গড়ে তুলেছেন এক দুর্ভেদ্য দুর্গ। তার এই দুর্নীতির সাম্রাজ্যের প্রধান সহযোগীদের মধ্যে রয়েছেন এসেসর কবির উদ্দিন চৌধুরী এবং কর্মচারী সংসদের নেতা বাবলু ও মাহবুব। ২০২৩ সালে পলাতক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর আমলে তার পিএস শহীদ চৌধুরী ও বাছিতের যোগসাজশে কয়েক কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হলেও, রহস্যজনক কারণে সুজনসহ সিন্ডিকেটের মূল হোতারা এখনো বহাল তবিয়তে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
কেবল হোল্ডিং ট্যাক্স নয়, বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড ও এলইডি সাইনবোর্ডের রাজস্বেও চলছে হরিলুট। ‘জামিল-রাশেদ-গৌতম’ নামে পরিচিত একটি সিন্ডিকেট নির্ধারিত হারের চেয়ে অনেক কম কর আদায় করে বাকি টাকা আত্মসাৎ করছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এই চক্রকে ‘অনানুষ্ঠানিক অর্থ’ না দিলে বিনা নোটিশে মামলা দায়ের বা অনুমোদন প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি করে তাদের জিম্মি করা হয়।
সিসিকের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা আক্ষেপ করে বলেন, “বাছিত-কবিররা একসময় রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় ক্ষমতা প্রদর্শন করতো। এখন সরকার বদলালেও তাদের দুর্নীতির নেটওয়ার্ক আগের মতোই রয়ে গেছে। আমরা নিয়মিত কর্মী হয়েও এদের দৌরাত্ম্যে কোণঠাসা।”
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রধান এসেসর মো. আবদুল বাছিতের ব্যবহৃত সেলফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। সিসিকের এই ‘সিন্ডিকেট রাজত্ব’ নিয়ে নগরজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। সচেতন মহল অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন, অডিট কার্যক্রম পরিচালনা এবং দুর্নীতির সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন। নগরবাসীর প্রত্যাশা, প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে সিসিকের কর শাখায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনবে এবং এই চক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধ করবে।
Leave a Reply