নিজস্ব প্রতিবেদক: সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে ইয়াবা সেবনের একটি ছবি ভাইরাল হওয়ার পর সিলেটের শাহপরাণ থানাধীন খাদিমপাড়া ইউনিয়নের দলইপাড়া এলাকায় এক বিশাল মাদক সিন্ডিকেটের চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে নিলামে কেনা হাইওয়ে পুলিশের পুরোনো ভ্যান ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে মাদকের রমরমা কারবার চালিয়ে আসছিল এই চক্রটি। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) পুলিশের এক অভিযানে দুই মাদক কারবারিকে আটকের পর ‘মব’ তৈরি করে পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে আসামি ও ব্যবহৃত পিকআপটি ছিনিয়ে নিয়েছে সংঘবদ্ধ এই চক্র।
সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া ওই ছবিতে দেখা যায়, দিনের আলোতে একটি ভবনের লোহার কোলাপসিবল গেটের একপাশে দাঁড়িয়ে লেগুনা চালক নাজমুল (কালো টি-শার্ট ও জিন্স পরিহিত) সরু পাইপ দিয়ে ইয়াবা সেবন করছেন। আর গেটের অপর পাশ থেকে তাকে লাইটার দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে সাহায্য করছেন সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি ও লুঙ্গি পরা শাহানুর। শাহানুর দলইপাড়া গ্রামের মছব্বিরের ছেলে। জনসম্মুখে এমন নির্বিঘ্নে মাদক সেবনের দৃশ্য সচেতন মহলকে গভীরভাবে আতঙ্কিত করে তুলেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, আবাসিক এলাকায় এমন প্রকাশ্যে মাদকের আসর বসানো তরুণ সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নাজমুল ও শাহানুরের মাধ্যমে এলাকায় ইয়াবার এই বিশাল নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করেন শাহানুরেরই দুই ভাই—জামায়াত নেতা আব্দুল আহাদ কুটুন ও শহীদ। অভিযোগ রয়েছে, শাহপরাণ পুলিশ ফাঁড়ির কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে তারা এই ওপেন মার্কেট তৈরি করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে চক্রটি নিলামে হাইওয়ে পুলিশের ব্যবহৃত একটি পুরোনো পিকআপ ভ্যান ক্রয় করে। দেখতে হুবহু পুলিশের গাড়ির মতো হওয়ায় তারা নির্বিঘ্নে সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে মাদক পরিবহন করে আসছিল।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) সন্ধ্যায় দলইপাড়া গ্রামে আব্দুল আহাদ কুটুনের দোকানের সামনে অভিযান চালায় শাহপরাণ থানা পুলিশের একটি দল। সেখানে পুলিশের স্টিকার বা রঙের আদলে থাকা ঢাকা মেট্রো ঠ-১৪-১২৭৫ নম্বরের ওই পিকআপ ভ্যানে তল্লাশি চালিয়ে ২৯৭ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এ সময় হাতেনাতে আটক করা হয় শহিদুল ইসলাম ও জাবেদ আহমদ নামের দুই মাদক কারবারিকে। তবে আটকের পরপরই আসামিরা চিৎকার শুরু করলে পরিস্থিতি মুহূর্তেই পাল্টে যায়। আব্দুল আহাদ কুটুন, নাজমুল ও শাহানুরের নেতৃত্বে ৩০-৩৫ জনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র ঘটনাস্থলে জড়ো হয়ে ‘মব’ সৃষ্টি করে। তারা পুলিশের পথরোধ করে এবং তাদের ওপর চড়াও হয়ে আটক দুই মাদক ব্যবসায়ীকে পিকআপসহ ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। তবে উদ্ধারকৃত ২৯৭ পিস ইয়াবা পুলিশ নিজেদের হেফাজতে নিতে সক্ষম হয়।
এ ঘটনায় শাহপরাণ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. আলিফ বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেছেন (মামলা নম্বর-৩০/৬৯)। মামলায় ৮ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৩০-৩৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।
এদিকে, প্রকাশ্যে মাদক সেবন এবং পুলিশের কাছ থেকে আসামি ছিনতাইয়ের মতো দুঃসাহসিক ঘটনায় এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। স্থানীয়দের দাবি, এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং যুবসমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে এই মাদক সিন্ডিকেট এবং এর নেপথ্যের গডফাদারদের অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। প্রশাসনের নীরবতা বা কতিপয় কর্মকর্তার মদদ থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
Leave a Reply