মোঃ রায়হান হোসেন: ভূমিকম্পপ্রবণ সিলেট মহানগরীতে একদিকে যেমন অনিয়মের মাধ্যমে গড়ে উঠছে বহুতল ভবন, অন্যদিকে সিটি করপোরেশনের (সিসিক) এসেসমেন্ট শাখায় চলছে কর আদায়ের নামে সীমাহীন লুটপাট। কর ও প্রকৌশল শাখার একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে সিসিকের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড আজ নড়বড়ে। বর্তমান পরিস্থিতিতে নগরবাসীর অভিযোগের পাহাড় জমলেও, অদৃশ্য খুঁটির জোরে বহাল তবিয়তে রয়েছেন অভিযুক্তরা।
সিসিকের এসেসমেন্ট শাখার কর নির্ধারণ নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে নগরজুড়ে তোলপাড় চলছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রধান এসেসর মো. আবদুল বাছিতের নেতৃত্বে চারজনের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এখানে গড়ে উঠেছে। সিন্ডিকেটের অন্য সদস্যরা হলেন—কবির উদ্দিন চৌধুরী, বাবলু এবং মাহবুব।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, হিসেবে মাঠ পর্যায়ে করের চিঠি পাঠানোর পর গ্রাহকদের হয়রানি করা হয়। অতিরিক্ত কর নির্ধারণের ভয় দেখিয়ে গ্রাহকদের বাছিতের সিন্ডিকেটের কাছে পাঠানো হয়। মোটা অংকের ঘুষ দিলেই নানা অজুহাতে কর কমিয়ে দেওয়া হয়। সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামানের এপিএস শহীদ চৌধুরীর সাথে এই সিন্ডিকেটের গভীর সম্পর্ক ছিল। তৎকালীন সময়ে ফাইল অনুমোদন থেকে শুরু করে কর কমানোর সব কাজ নিয়ন্ত্রণ করতেন শহীদ চৌধুরী, আর অর্থের লেনদেন করতেন বাছিত।
কর শাখা যেন বাছিতের পারিবারিক সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। এখানে তার শ্যালক, ভাতিজা ও ভাগিনাদের দাপটে সাধারণ কর্মচারীরাও মুখ খোলার সাহস পান না।টাইপিস্ট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা আবদুল বাছিত বর্তমানে প্রধান এসেসরের দায়িত্ব পালন করছেন, যা চাকরির বিধিবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। শুধু কর শাখাই নয়, প্রকৌশল শাখার অনিয়মে সিলেট এখন অপরিকল্পিত নগরায়ণের ঝুঁকিতে। বিল্ডিং কোড অমান্য করে গড়ে উঠছে একের পর এক বহুতল ভবন।পাঠানপাড়া আবাসিক এলাকায় ৮ ফুট রাস্তাকে ১২ ফুট দেখিয়ে অনুমোদন নেওয়ার নজির মিলছে অহরহ। অথচ পরবর্তীতে নিয়ম ভাঙার অভিযোগ তুলে ভবন মালিকদেরই নোটিশ ধরিয়ে দিচ্ছে সিসিক।
সিসিকের প্রধান প্রকৌশলী নুর আজিজুর রহমান স্বীকার করেছেন, তথ্য গোপন করে বা কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে এই অনিয়মগুলো হয়েছে। দায়িত্বরত লোকজনের অর্থ গ্রহণের বিষয়টিও তার বক্তব্যে উঠে এসেছে। গত বছরের জুন মাসে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের পর সিসিক কর্তৃপক্ষ পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও আজ পর্যন্ত এর কোনো দৃশ্যমান ফলাফল মেলেনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, অতীতেও অসংখ্য তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও সেগুলো আলোর মুখ দেখেনি। ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের মিটার চুরির মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনার তদন্ত রিপোর্টও রয়ে গেছে অধরা।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী গণমাধ্যমে বলেন, “বিল্ডিং কোড না মেনে গায়ের জোরে বহুতল ভবন নির্মাণ আগামীতে সিলেটে ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। আমরা এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের জোরালো ও দৃশ্যমান উদ্যোগ চাই।”
সিসিকের বর্তমান প্রশাসকের কাছে ভুক্তভোগীদের দাবি, শুধু অফিসে বসে লোক দেখানো তদন্ত না করে মাঠ পর্যায়ে বড় বড় বাণিজ্যিক ভবনগুলোর ট্যাক্স ফাইল যাচাই করা হোক। আবাসিক ও নিজ ব্যবহারের পরিচয় দিয়ে যারা বাণিজ্যিক ভবনের কর ফাঁকি দিচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। সিলেট নগর ভবনকে দুর্নীতিমুক্ত করে সেবার কেন্দ্রবিন্দুতে ফেরাতে অভিযুক্ত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির কোনো বিকল্প নেই।
Leave a Reply